শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশিত : ১২:১৮ অপরাহ্ন শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
অনলাইন ডেস্ক: দেশের অপরাধ জগতে দশকের পর দশক কলকাঠি নাড়ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। আধিপত্যের লড়াইয়ে কেউ দেশের বাইরে থেকে আবার কেউ দেশে বসেই একের পর এক টার্গেট কিলিং, গুলি ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনায় দাগি আসামিদের পাশাপাশি সামনে আসছে আলোচনার বাইরে থাকা শুটারদের নাম। স্বার্থে টান পড়লেই সহযোগীদের পাঠিয়ে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে পথের কাঁটা। কিন্তু দৌরাত্ম্য কমে না হত্যার নির্দেশদাতাদের। ফলে হত্যার রহস্য অনেক ক্ষেত্রে অজানাই থেকে যাচ্ছে। প্রতিটি কিলিং মিশনের পরে চাঁদার বাজারে কদর বাড়ছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছেন, আসন্ন কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ইজারা বাকি থাকা পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে বেড়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে কিলিং মিশনের উত্তাপ। প্রযুক্তির সহায়তায় সানজিদুল ইসলাম ইমন, বাড্ডার মেহেদী হাসান ও আরও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর চাঁদাবাজির বিষয়ে তথ্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু কোনো ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অভিযোগ না করায় এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাচ্ছে না তারা। এতে ধারণা করা হচ্ছে, টার্গেট কিলিংয়ের ভয়ে আপসরফা করে নিচ্ছেন টার্গেটকৃত ব্যক্তিরা। এদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্তাপ না কমায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিদেশি নম্বর দেখলেই আঁতকে উঠছেন অনেক ব্যবসায়ী। শঙ্কার বাইরে নন রাজনৈতিক নেতারাও। ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, পোশাক কারখানার ঝুট, বাসাবাড়ির ময়লা, ঠিকাদারি কাজ ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কদর কেন কমে না সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। ফলে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তাদের ওপর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রশ্রয় ও যারা ব্যবস্থা নেবেন তাদের কারও কারও সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সখ্যের অভিযোগও রয়েছে। এতে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ধরাছের্ঁায়ার বাইরে থাকছে।’ তিনি মনে করেন, জামিনে থাকা সন্ত্রাসীদের নজরদারির আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে মানুষের আস্থা বাড়বে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটলে তা তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।’
কেন কিলিং মিশনের পরিকল্পনা : পুলিশের এক সূত্র জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ডে সন্ত্রাসীদের অন্তঃকোন্দলে কিলিংয়ের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। সাধারণত কোনো গ্রুপ চাঁদায় ভাগ বসালে, কোনো গ্রুপের শুটার নিখুঁত কিলিংয়ে হিরো হয়ে উঠলে তার লাগাম টানতে, নতুন এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে সেখানকার নেতৃত্বকে সরাতে এবং ইজারা ও টেন্ডার পছন্দের ব্যক্তিকে পাইয়ে দিতে শুটারদের ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতা ও ঠিকাদাররা বড় অঙ্কের কোনো প্রজেক্টের কাজ পেলে তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় কিলিং মিশন। এ ছাড়া বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ে রাজি হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা।
ঈদের চাঁদাবাজিতে উত্তাপ বাড়ছে : গত দেড় বছরের বেশি সময়ে রাজধানীতে ঘটা বেশ কয়েকটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা দেখলেই বোঝা যায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ক্ষমতার লড়াইয়ে হিংস্র হয়ে উঠতে। সবশেষ ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় টিটন হত্যাকাণ্ডের পর আলোচনায় আসে বসিলা পশুর হাটের ইজারার দ্বন্দ্ব। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু পশুর হাট কেন্দ্র করে টিটনকে হত্যার পরিকল্পনা হয়নি। এর পেছনে রয়েছে আরও বড় স্বার্থ। গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার হয়ে লালবাগ পুরো এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকার একটি দেশে অবস্থান করছেন। টিটন শ্যালক হলেও এ হত্যায় সন্দেহের বাইরের নন ইমন। যদিও টিটনের পরিবার চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে। তারা হলেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ডাগারি রনি।
ধরাছোঁয়ার বাইরে নির্দেশদাতারা : ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনার মাধ্যমে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের খুনাখুনির বিষয় আলোচনায় আসে। ওই খুনের আসামি পিচ্চি হেলালের নাম টিটন হত্যায়ও এসেছে। কিন্তু তিনি থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশে থেকেই নিজের সাম্রাজ্য সামলাচ্ছেন তিনি। গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর গত বছরের ২৫ মে বাড্ডার গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সূত্র জানান, বাড্ডায় ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মেহেদী (যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন) ও মাহবুব (মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন) গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা দুটি ঘটে। কিন্তু হত্যাকাণ্ড দুটির নির্দেশদাতারা দেশে না থাকায় রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় খুন হন শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন। এ হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে বিদেশে পলাতক ইমনের নাম আসে। এ ছাড়া তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির ও পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া খুনে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের নাম আসে। কিন্তু দেশের বাইরে থাকায় তারাও সবাই অধরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, ঘটনা ঘটার পর শুটার ও নির্দেশ পালনকারী কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু নির্দেশদাতারা অধরা থাকায় হত্যার কারণ সম্পর্কে শুধুই আধিপত্যের লড়াই সামনে আসে। সূত্র জানান, পট পরিবর্তনের পর জামিনে মুক্ত হয়ে সন্ত্রাসীরা নিজেদের এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এতেই উত্তাল হয়ে ওঠে আন্ডারওয়ার্ল্ড। যে যাকে সুযোগ পাচ্ছে গুলির নিশানা বানাচ্ছে। বর্তমানে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে ইমন, পিচ্চি হেলাল, মেহেদী ছাড়াও আলোচনায় রয়েছে কিলার আব্বাস, শাহাদাত হোসেন, জিসান আহমেদ, হাবিবুর রহমান তাজ, ইমাম হোসেন, খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। অপরাধী দেশের বাইরে বা ভিতরে থাকুক, সেটি আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। তদন্তে যারই নাম আসবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, ‘যারা দেশের বাইরে আছেন, তাদের সংশ্লিষ্টতা পেলে চার্জশিটে নাম উল্লেখসহ অন্য আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।’