একটি ভাবনা: একই মায়ের গর্ভের কষ্টের সন্তান (হিজড়া) এরাও আমাদের সন্তান

0
814

একটি ভাবনা ঃ মোঃ মাজহারুল ইসলাম

একই মায়ের গর্ভের কষ্টের সন্তান (হিজড়া)ঃ এরাও আমাদের সন্তান
একটি দেশের উন্নয়ন যেমন একক কোন মানদন্ডের উপর নির্ভর করে বলা যায় না, তেমনি কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির সাবির্ক কল্যাণ ব্যতিরিকি একটি দেশকে নৈতিক আদর্শীক দেশ বলা যায় না। অনেক দিন ধরে রাষ্টীয়ভাবে এই বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠি হিজড়াদের উপর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও কার্যকরী কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের রুপ নেয়নি। পথে ঘাটে বিভিন্ন জায়গায় যখন এই জনগোষ্ঠি দু’বেলা দু’মুঠো ভাত, বাসা ভাড়া এবং জীবন চলার জন্য আমাদের কাছে হাত বাড়িয়ে দেয় তখন আমরা অনেকেই ওদের প্রতি করে বসি নেতিবাচক মন্তব্য। আর যদি সাহায্য চাওয়ার পক্রিয়াটি হয়ে থাকে ভিন্ন ঢং এর, তাতে সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করতেও ভুল করেন না কেউ কেউ। কিন্তু আমরা যদি ভেবে দেখি, ওদের জন্য এই রাষ্ট্র এই সমাজ এই পরিবার ওদের জীবন চলার জন্য কি কোন বিশেষ ব্যবস্থা করে দিয়েছি? দিয়ে থাকলেও তা খুবই সামান্য।
এই সব দিক বিবেচনা করে আমার প্রতিষ্ঠিত সচেতনতামূলক সামাজিক আন্দোলন ‘এসো সচেতন হই (এসই)’ বেশ কয়েকটি কর্মসূচির মধ্যে বৈচিত্র্যময় এই হিজড়া জনগোষ্ঠির কল্যাণে সমাজের মানুষের কাছে তাদের মানবিক অধিকার বিষয়ে সচেতনতা করার লক্ষ্যে ‘একই মায়ের গর্ভের কষ্টের সন্তান (হিজড়া)ঃ এরাও আমাদের সন্তান’ কর্মসূচিটি হাতে নিয়েছে।
আমি মনে করি, হিজড়া সম্বন্ধে আপনার নেতিবাচক মন্তব্য মানেই হিজড়া সন্তানের পরিবারের বোঝাস্বরুপ। হিজড়া সন্তানটিকে তার পরিবারে অর্থাৎ বাবা-মা’র সাথে একসাথে থাকতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে প্রতিবেশী বা আত্ময়ীস্বজনের নেতিবাচক মন্তব্য। এমনকি হিজড়া সন্তানসহ পরিবারটিকে একঘরে বা বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি করার কারণে পরিবার থেকে বিতাড়িত হতে বাধ্য হয় হিজড়া সন্তানটি। মা-বাবা, ভাই-বোনের মায়ামমতা ভালোবাসা ছেড়ে একসময় আশ্রয় নিতে হয় হিজড়া কমিউনিটিতে। শুরু হয় তার জীবনে বেঁেচ থাকার সংগ্রাম। একসময় হয়ে পড়ে এই সমাজের মানুষের চোখে উপহাসের পাত্র। আমরা কখনো ভাবী না হিজড়া সন্তানটিও আমাদের সন্তান।
আমি মনে করি, কিছু পলিসি নিয়ে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠি হিজড়াদের জীবন কষ্ট অনেকাংশেই লাঘব করা সম্ভব।
প্রথমত ঃ হিজড়া সন্তানের পরিবার প্রধানকে বাধ্য করতে হবে সন্তানকে পরিবারে রাখার। আর তারজন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে স্যোসাল এ্যাকশন তৈরি করে বুঝাতে হবে হিজড়া জনগোষ্ঠি আপনার আমারই সন্তান। এই পৃথিবীর সকল প্রাণীকে নিয়নন্ত্রণ করেন মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা। আমরা যেমন বলতে পারি না, কাড় সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে, আর হলেও কি ধরনের প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। ঠিক তেমনি আমরা বলতে পারি না, আপনার সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, সুস্থ না প্রতিবন্ধী হবে, হিজড়া না অন্যকিছু হবে? এতে যেমন কারোর হাত নেই, তেমনি হিজড়া হওয়াটাও ঐ পরিবারের বা হিজড়া সন্তানটির কোন অপরাধ নেই।
দ্বিতীয়তঃ হিজড়া জনগোষ্ঠি সম্বন্ধে স্কুলের পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। যাতে কোমলমতি ছোট্ট শিশুরা ছোটকাল থেকেই ধারণা লাভ করবে নারী, পুরুষ ছাড়াও বৈচিত্র্যময় হিজড়া জনগোষ্ঠি রয়েছে।
তৃতীয়ত ঃ হিজড়াদেরকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে তারা কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেরাই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
চতুর্থত ঃ হিজড়াদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি প্রদানে সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করতে হবে। এই বিষয়ে নিয়মনীতি প্রনয়ণ করতে হবে। কর্মস্থলে হিজড়া কর্তৃক কারো বিরুদ্ধে কোন যৌন হয়রানীর অভিযোগ পেলে ত্বরিত গতিতে তদন্ত সাপেক্ষে সরকারীভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পঞ্চমত ঃ হিজড়া জনগোষ্ঠিকে তাদের যোগ্যতা এবং আগ্রহ অনুযায়ী রাজনীতিতেও স্থান করে দেয়া যেতে পারে।
ষষ্ঠ ঃ নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ওদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়ে থাকলে আইন সংশোধন করে এই বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠি হিজড়াদেরকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
সপ্তম ঃ হিজড়াদের উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক এবং কঠিন আইন প্রনয়ণ করতে হবে। তা বাস্তবায়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়কে মনিটরিং এর জন্য দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে ল্যান্ড অপ কমিশন (এসিল্যান্ড) কে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে।
আমি মনে করি, উক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই বাচাই করে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমার দেশ যেমন বিভিন্ন বিষয়ে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এখানে এই জনগোষ্ঠিকে বাদ দেয়া মানেই ওদের প্রতি অবহেলা করা। কল্যাণকামী রাষ্ট্র কখনো তার জনগণকে অবজ্ঞা করতে পারে না।
আমি মনে করি, এই দায়িত্ব শুধুমাত্র সরকারের উপর ন্যস্ত না করে বিভিন্ন ধরনের বেসরকারী সংস্থা, বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক আন্দোলন, বড় কোন প্রতিষ্ঠান মানবিক কার্যবলীর অংশ হিসেবে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। আর তাই সামাজিক সচেতনতামূলক আন্দোলন ‘এসো সচেতন হই (এসই)’ এর বেশ কয়েকটি কার্যাবলীর মধ্যে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠি হিজড়াদের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে, ‘একই মায়ের গর্ভের কষ্টের সন্তান (হিজড়া)ঃ এরাও আমাদের সন্তান’ নামে একটি কর্মসূচি। আমি যে সকল দিকের কথা উল্লেখ করেছি, কিছু পদক্ষেপ সরকার ব্যতিত একক বা ব্যক্তিগত কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে আমি এই কর্মসূচির মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠি সম্বন্ধে মানুষের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব, নৈতিকমূল্যবোধ, ছোট্টশিশু থেকে শুরু করে সববয়সী মানুষের মধ্যে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী আনয়নে সচেতনতা সৃষ্টি এবং অন্যদিকে হিজড়া জনগোষ্ঠিদের মধ্যেও সমাজিক কোন নীতি, নৈতিকতা, আদর্শিক দিক থেকে কোন কমতি থাকলে তা বাহির করে সেই সম্পর্কে ঐ জনগোষ্ঠির মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টি করা।
‘একই মায়ের গর্ভের কষ্টের সন্তান (হিজড়া)ঃ এরাও আমাদের সন্তান’ কর্মসূচির এবং ডায়াবেটিস কুসংস্কার দূরীকরণ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়েছে মোঃ ফরিদুল ইসলাম (জুনাক হিজড়া) এর সাথে। এখানে উল্লেখ্য, জুনাক বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠি হিজড়াদেরকে নিয়ে কাজ করছেন। প্রসঙ্গত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিভাগ থেকে বিএসএস (সম্মান); এমএসএস ডিগ্রি লাভ করেছেন।
আমি মনে করি, আমরা সবাই মানুষ। আজকে কোন এক পরিবারে হিজড়া সন্তান জন্মগ্রহণে আপনি আমি নেতিকবাচক মন্তব্য করছি, কিন্তু এটাও তো হতে পারে, কাল আপনার আমার পরিবারে হিজড়া সন্তানের জন্ম হয়েছে।
আসুন, আজ থেকে ভাবী, হিজড়া, এরাও আমাদের সন্তান
অবহেলা না করে, আদরে জুড়িয়ে দেই ওদের প্রাণ।

লেখক ঃ কলামিস্ট ও সমাজকর্মী
E-Mail: mazharulsust86@gmail.com
মোবাইল : 01712651032

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে