মহামায়ার ‘কায়াকি’ পর্যটকদের এখন অন্যতম আকর্ষণ

0
481

শুষ্ক মৌসুম মানে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর মোক্ষম সময়। প্রকৃতিতে যখন বৈরীতা থাকে না তখন গৃহ ও অফিসপাড়ায় বন্দি মানুষগুলো যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। কারণ অনেক সময় বেড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও প্রকৃতির বৈরী আচরণের কারণে তা অনেকটা হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে বছরের শেষের দিকে থেকে নতুন বছরের শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ এবং অফিসপাড়ায় কাজের চাপ কম থাকায় এই সময়টুকুকে অনেকে বেড়ানোর জন্য নির্ধারণ করে রাখেন। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বার্ষিক শিক্ষা সফর কিংবা আনন্দ ভ্রমণের জন্য বছরের শুরু থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টুকুকে নির্বাচন করেন।

এদিকে অনেকে স্বদেশের মাটি ও প্রকৃতি ছেড়ে সুদূর প্রবাসে যান বেড়াতে। কিন্তু স্বদেশের যে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য রয়েছে তা অনেকে হয়ত হেয়ালি করে উপলব্ধি করতে পারেন না। কবির ভাষায় বলা যায় ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সেযে আমার জন্মভূমি’।
জন্মভূমির প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের একটি অন্যতম বাহার হচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মহামায়া প্রাকৃতিক লেক। যার একপ্রান্তে রয়েছে খোলা মাঠ, অপর প্রান্তে রয়েছে পাহাড় ঘেরা আঁকাবাঁকা মিঠাপানির লেকের ধার। চারদিকে সবুজের বেষ্টনীর মাঝে পাহাড় যেন মেঘের মতো একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। একধারে রয়েছে ঝর্ণার ধারা- এ যেন প্রকৃতির অপরূপ খেলা। প্রকৃতি যেন পূর্ণ যৌবনে সমৃদ্ধ হয়ে সেজে আছে নববধূর সাজে। হাতছানি দিয়ে ডাকছে পর্যটকদের।

এদিকে লেকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ইজারাদাররা লেকে ডিঙি নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবস্থা রেখেছেন। বর্তমানে যুক্ত হয়েছে ‘কায়কী’ নামক ডিঙি নৌকা। মাত্র দু’জনের বসার জায়গা রয়েছে এটাতে। শরীরে লাইফ জ্যাকেট পরে মাথায় হেলমেট লাগিয়ে দু’জনের হাতে দু’টি বৈঠা বেয়ে চলে লেকের ধারে ঘুরে বেড়ানো। বর্তমানে পর্যটকদের কাছে এটাই এখন অন্যতম আকর্ষণে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে প্রেমিক যুগলদের জন্য এটা অন্যতম বিনোদন বটে। ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নিয়ে তারা লেকের মাঝে পড়ে যে ছোট দ্বীপের মতো মাটির অবস্থান রয়েছে সেখানে তারা নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে পারে বলে।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি পুরো এলাকাটি। লেকের স্বচ্ছ নীলাভ জল, চারপাশের সবুজের চাদরে ঘেরা এমন পরিবেশে পর্যটক টানতে নতুনভাবে যোগ হয়েছে কায়াকিং অ্যাডভেঞ্চার। চারদিকে অথৈই জলে নিজের হাতে চলবে এই নৌকা। এমন অ্যাডভেঞ্চার নিশ্চয়ই কেউ মিস করতে চাইবে না। আর সে কারণেই মহামায়া কায়াকিং পয়েন্টে বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়। প্রতিদিন কায়াকিং করছেন শতাধিক দর্শনার্থী। বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কায়াকিংয়ে আগ্রহী।

মহামায়া কায়াকিং পয়েন্টের পরিচালক মামুনুর রশিদ রানা জানান, বাংলাদেশে কাপ্তাইয়ের পরে এখানেই আছে কায়েক নৌকা। আর কোথাও এমন অ্যাডভেঞ্চার নেয়ার সুযোগ নেই যাত্রীদের। তিনি জানান, মহামায়ার কায়াকগুলো অন্য স্থান থেকে আরো উন্নত ও নিরাপদ। এগুলো আমদানি করা হয়েছে সুদূর ব্রাজিল থেকে।

মামুনুর রশিদ রানা জানান, প্রতিটি কায়াকিং নৌকা প্রতি ঘণ্টায় ৩শ’ টাকায় ভাড়া দেয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য ছাড় দেয়া হয় ১শ’ টাকা। রয়েছে নির্ধারিত সীমানা রেখা। এর বাইরে গেলে পর্যটকদের গুনতে হয় ১ হাজার টাকা জরিমানা। এ সময় আরো কথা হয়, দর্শনার্থী রাজু, জিসান, সৌরভ, প্রিয়াঙ্কা ও মহুয়াদের সঙ্গে।

তারা জানান, নিজ হাতে কায়াকি নৌকা চালিয়ে পাহাড় আর সুবজের নীলাজলের বুক চিরে ইচ্ছেমতো ঘুরতে দারুণ লাগে। কায়াকিং পয়েন্টের লোকেরাই শিখিয়ে দেয় কিভাবে কায়াকিং করতে হয়। যার কারণে চালাতে তেমন বেগ পেতে হয় না। বিষয়টাতে দারুণ অ্যাডভেঞ্চার রয়েছে।

কায়াকিং পয়েন্টের পরিচালক মামুনুর রশিদ রানা জানান, তিনিসহ ৫ জন শামীম হোসেন, সাইদুল ইসলাম, সাইফুদ্দিন শামীম ও স্নেহাশীষ জনি মিলে এ লেকে ১৬টি কায়েক নামিয়েছেন। ধীরে ধীরে দর্শনার্থীরা আগ্রহী হয়ে উঠছে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক লোক কায়াকিং করছেন।

মহামায়া লেক: বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ মহামায়া লেক। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ লেকটি চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পিকনিকের জন্যও মহামায়া দারুণ একটা জায়গা। এখানে এসে রান্না-বান্না করে খাওয়ারও সুযোগ রয়েছে।

যাতায়াত: ঢাকা-চট্টগ্রামের যে কোনো বাসে করে সরাসরি নামতে হবে মিরসরাইয়ের ঠাকুরদীঘি এলাকায়। সেখান থেকে রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশাযোগে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছা যাবে মহামায়ায়।