১৫ বছরের পুরনো সিএনজি অটোরিকশা চলবে না

0
534

সিএনজিচালিত অটোরিকশা ১৫ বছরের বেশি চলবে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো অটোরিকশা বন্ধে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে অটোরিকশা মালিকদের দাবি, ভালো অবস্থায় থাকা অটোরিকশার আয়ুর মেয়াদ তিন বছর বাড়াতে হবে, অন্যথায় আন্দোলনে যাবেন তারা।

জানা যায়, ১৫ মার্চ বিআরটিএকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীতে মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের কাজ আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে। আর চট্টগ্রামে তা করতে হবে জুলাইয়ের মধ্যে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার অনুলিপি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে বিআরটিএকে। প্রতিস্থাপন দ্রুত করতে প্রয়োজনে দুই মহানগরে একাধিক স্থানে কাজ করার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে।

ঢাকায় ১৩ হাজার ৬৫২টি এবং চট্টগ্রামের ১৩ হাজার মিলিয়ে ২৬ হাজার ৬৫২টি অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে ঢাকায় ২০০২ সালে পাঁচ হাজার ৫৬১টি এবং চট্টগ্রামে সাত হাজার ৪৫৯টির নিবন্ধন দেয়া হয়। এই ১৩ হাজার ২০টি অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। নিবন্ধিত অটোরিকশার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪০০ বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের বিপরীতে আবার নতুন মডেলের অটোরিকশা নামানো হয়েছে। পুনঃনিবন্ধিত এসব অটোরিকশা প্রতিস্থাপন করতে হবে না। দুই মহানগরে চলাচলকারী বাকি ১৩ হাজার ৬৪২টি অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হবে এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর। ১৫ বছর পূর্ণ হওয়া এসব অটোরিকশার মেয়াদ আরো বাড়াতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন মালিকরা। মেয়াদ বাড়ানো যায় কিনা তা জানতে বিআরটিএ গত বছরের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে চিঠি দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বুয়েট ৬ মার্চ বিআরটিএকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়, এসব অটোরিকশার মেয়াদ আর বাড়ানো যাবে না।

প্রচলিত নিয়মে মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার বদলে একই রেজিস্ট্রেশন নম্বরে নতুন অটোরিকশার নিবন্ধন পাবেন মালিকরা। বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী তারা অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু করবেন।

চলতি মাসে যেসব অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সেগুলোর পাঁচ হাজার ৫৬১টি ঢাকার ও বাকি দুই হাজার ৮৬৩টি চট্টগ্রামের। আগামী ১ এপ্রিল থেকেই এগুলো বন্ধ হবে কিনা- তা নিশ্চিত করেনি বিআরটিএ। নিয়ন্ত্রক এ সংস্থাটির পরিচালক (প্রকৌশল) নূরুল ইসলাম বলেছেন, প্রতিস্থাপনে মালিকদের আবেদন করতে হবে। প্রতিস্থাপন না হওয়া পর্যন্ত পুরনো অটোরিকশা চলতে পারবে কিনা তা বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।

অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, সাড়ে ২৬ হাজার অটোরিকশার মধ্যে ৩৬টি পরীক্ষা করে মেয়াদ না বাড়ানোর মতামত দিয়েছে বুয়েটে। সব অটোরিকশার অবস্থা খারাপ নয়। যেগুলো চলাচলের উপযোগী সেগুলোর মেয়াদ তিন বছর বাড়াতে হবে। মালিকদের হুঁশিয়ারি দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনে নামবেন তারা। এ প্রসঙ্গে বরকত উল্লাহ বুলু জানান, আগামী সপ্তাহে তারা বিআরটিএর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন ছাড়া পথ খোলা নেই। সরকার ভোটের বছরে মালিকদের আন্দোলনে ঠেলে দেবে না বলে তাদের বিশ্বাস।

পুরনো বিকল অটোরিকশা প্রতিস্থাপনে বিআরটিএতে ৫২০টি আবেদন জমা পড়েছে। মালিকরা এখনো নতুন অটোরিকশার নিবন্ধন পাননি। বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, বিআরটিএ আড়াই মাসে পাঁচশ’ অটোরিকশা প্রতিস্থাপন করতে পারেনি, তারা আগামী ৬ মাসে আট হাজার অটোরিকশা প্রতিস্থাপন করবে কী করে! অটোরিকশা বন্ধ হলে যাত্রী ভোগান্তি হবে, চালক-শ্রমিকরা বেকার হবে।

অটোরিকশার মেয়াদ বাড়াতে গত ছয় মাস ধরে মালিক-শ্রমিকদের একাংশ সক্রিয় রয়েছে। গত বছর দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের পক্ষে তারা, কিন্তু শ্রমিক চালকদের বেকার করে নয়।

বুয়েটের প্রতিবেদনে পুরনো অটোরিকশার বিষয়ে দুটি বিকল্প রাখা হয়েছে। প্রতিটি অটোরিকশা পরীক্ষা করে ভালো অবস্থায় থাকা ইঞ্জিন ও চেসিস অটোরিকশার মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর বাড়ানো যেতে পারে। তবে ২৩ শতাংশের বেশি অটোরিকশা এ সুযোগ পাবে না বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। পরীক্ষাকৃত ৭৭ শতাংশ অটোরিকশার চেসিস মানসম্মত অবস্থায় নেই।

বুয়েটের যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগের পাঁচ অধ্যাপকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইঞ্জিন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ ১৫ বছরের পুরনো অটোরিকশার ইঞ্জিন ১৫৫ সিসির। কিন্তু বর্তমানে যেসব অটোরিকশা বাজারে রয়েছে, সেগুলোর ইঞ্জিন ২০৫ সিসির। ইঞ্জিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে পুরনো মডেলের ইঞ্জিন উৎপাদনের বিষয়ে জানতে চাইলে জবাব পাওয়া যায়নি।

বুয়েটের প্রতিবেদনেও বলা হয়, ৯৫ শতাংশ অটোরিকশাই মিটার মেনে চলে না। পুরনো অটোরিকশার মেয়াদ তিন বছর বাড়ালে তাতে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। নতুন অটোরিকশা কিনতে ব্যয় হবে চার লাখ ১০ হাজার টাকা। পুরনো অটোরিকশার মেয়াদ বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা সাশ্রয় সম্ভব, কিন্তু তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না।

অন্যদিকে পুরনো অটোরিকশা ধ্বংস করতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিআরটিএর দুই উপপরিচালককে আহ্বায়ক করে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়েছেন বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল) নুরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গত সপ্তাহে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠিয়েছি। এটি একটি বিরাট কর্মযজ্ঞ, অটোরিকশা ধ্বংসের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করতে হবে। বুলডোজার, গ্যাস কাটারসহ যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। এ জন্য ফান্ডের প্রয়োজন আছে।

নুরুল ইসলাম জানান, অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের জন্য উপপরিচালকদের কাছে আবেদন করতে হবে মালিকদের। দরখাস্ত হাতে পেলে উপপরিচালক একটি সিরিয়াল নম্বর দেবেন। প্রতিদিন ৫০টি অটোরিকশার নম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে। নির্ধারিত তারিখে দরখাস্ত, মালিকানার মূল কাগজপত্র, সিরিয়াল নম্বরসহ অটোরিকশা মালিকরা যেখানে অটোরিকশাগুলো ভাঙা হবে সেখানে হাজির হবেন। মালিক ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত হতে পারবেন না। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে অটোরিকশাগুলো ধ্বংস করা হবে। ধ্বংসের পর মালিকদের একটি প্রত্যায়নপত্র দেয়া হবে। এই কাগজটি দেখিয়ে নতুন অটোরিকশার নিবন্ধন করতে পারবেন মালিক।

এ প্রক্রিয়া শেষ করতে কতদিন সময় লাগতে পারে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে এখনো সঠিক তারিখ দেয়া সম্ভব না। কিছুটা সময় লাগবে এগুলো ঠিক করে কাজ শুরু করতে। যদি সবার সহযোগিতা পাই তাহলে আমাদের দুই মাস লাগবে না। সব শেষ করে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করতে পারব।