সেলিম আল দীন নিয়ে টুকরো কথন

0
727

অ আ আবীর আকাশ: বাংলা নাট্যাঙ্গনে যে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিল আলো হয়ে, যাদের স্পর্শে ধ্যাণ-ধারণায় আর মেধার স্ফুরণে বাংলা নাট্যাঙ্গন আজ বিশ্বদরবারে পরিচিত তাদের একজন সেলিম আল দীন।

শিক্ষকতার মতো মহান পেশার পাশাপাশি নাট্য ভুবনে যার হাত ধরে এমন অনেক ব্যক্তি আজ প্রতিষ্ঠিত। সুনামের সাথে তারা সবাই যার যার স্বকীয়তার পরিচয় দিচ্ছেন। শিল্প তাত্ত্বিক সেলিম আল দীন বিশ্বাস করতেন `শিল্পের সকল ধারা এক বিন্দু থেকে উৎসারিত। বাহ্যিক পৃথক হলেও এর মূল উৎস একই মোহনায় মিলিত হয়।’

সেলিম আল দীন কেবল নাটকে স্থিত ছিলেন না। শিল্পের হাত ছড়িয়েছেন বহুমাত্রিকতার দিকে। শিল্পের সব ধারাকে ছুঁয়ে দেখার স্বাদ সর্বত্রই জাগরুক ছিল তাঁর ভেতরে। নাট্যাঙ্গনের পাশাপাশি সেলিম আল দীন নব্বই সালে গঠন করেন `কহন কথা ‘নামে গানের দল। নাটকের মত সংগীতকে তিনি আরাধনার মতো করে নিয়েছেন। নাটক ও সঙ্গীকে তিনি এতো ভালোবাসতেন যে মৃত্যুর মাত্র পাঁচদিন আগে ৯ জানুয়ারি অসুস্থ শরীরে হারমোনিয়াম নিয়ে মগ্ন হয়েছিলেন গানের সুর করতে। তিনি গাইতে থাকেন -`আমি মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন রাতে/ পূর্ণ চাঁদের উদয় কালে /সন্ধ্যাবেলায় দুহাত তুলে বলেছিলাম /প্রভু আমার মনে শান্তি বইয়ে দাও।’

এরকম বহু গান সেলিম আল দীন লিখেছেন। এসব গানের মধ্যে নির্বাচিত কয়েকটি পংক্তি তুলে ধরছি- (১)অনেক অনেক আগে ঝাঁকড়া চুলে/ দেবদারু পাতা খসা দিন /মনে হল ঘুরে আসি সর্বপ্রাণতার /গুপ্ত চলাচল।
(২) মৃত্যুর কোন অমোঘ ঠিকানায় /ওরা চলে যায়/ ওই পাখি শিস দিচ্ছে গান গাইছে/ উড়াল দিচ্ছে আকাশে। (৩)হায়রে আমার বালুঘড়ি দিন/হায়রে আমার রাত্রি ঝরা মেঘ/হায়রে আমার লুপ্ত দিনের ভাষা। (৪) ফেলে এলাম ফিরে এলাম/ সাদা মেঘের জল কল্লোল শঙ্খ বাতাস/ ফেলে এলাম সূর্যকিরণ/ বিচ্ছুরণের স্বর্ণ কুহক। (৫) নিজের রুদ্ধশ্বাসের ভালবাসা সমুদ্র কিনারে /কুলের চিবুক ভিজায় ফেনা /তা সে উঠুক যত/ ছোঁবে না তোমাকে। (৬)এ আষাঢ়ের মেঘ স্তরে ঢেউ উঠেছে/ বাউল বাউল গন্ধ মেখে উঠেছে।(৭) হায়রে কে কবে দেখেছে শিশু সকালের উপর /সন্ধ্যা ঝাঁপিয়ে পড়ে /রাত্রি ঝাঁপিয়ে পড়ে/নিয়ে যায় মরণ সারস ডানায়। (৮)আমি নদীর কাছে গিয়েছিলাম, নদী বলল না না না না /শুষ্ক চরে উড়িয়ে ধুলো বাও কুড়ানির খেলা না না না না। (৯) রাতের চাঁদের আলোয়/ নিরেট চিবুকে তোমার /দোলাচল দোলাচল খেলা করে যায়।(১০) আমি যতবার উড়াল মেঘের শরীর ছুঁতে চাই/ দ্রুত ভেঙে যায় ধাওন্ত গড়ন গঠন।

শান্তি অনশনে চলে গেলেন সেলিম আল দীন অজানা দেশে। তবে কৌতুহলী বক্ত শ্রোতার প্রশ্নবোধক চিহ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠেন-` সেলিম আল দীন ফিরবেন পাখি হয়ে, কিবা ভোরের শিশির হয়ে, সোনালী দেশে সবুজের হাতছানিতে। তবে দুঃখ হয়- তার প্রস্থান সময়ে রচিত গানগুলো ভক্তিসুলভ ভরে কে গাইছেন, কোথায় গাইছেন, তা তিনি দেখে যেতে পারেননি।

তিনি আমাদের মাঝে বাংলা সাহিত্যে যে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তা হলো গানের ভিতরে আবৃত্তির প্রয়োগ। কিন্তু তার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল মহাপ্রয়াণের ভেতরে।

অ আ আবীর আকাশ: কবি ও সাংবাদিক
abirnewsroom@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে