ভূত দেখেছি ! কবি: অ আ আবীর আকাশ

24
874

ভূত দেখেছি !

অ আ আবীর আকাশ

১.
ভূত? হ্যাঁ, আমি নিজ চোখেই দেখেছি। বিশ্বাস হয়না? হবেই কেমন করে,তোমরা তো কেউ দেখোনি, ভুত যে বিশাল অদ্ভুতুড়ে জিনিস। এটা যে কেউ দেখতে পায়না। আমি কেমন করে ভুত দেখেছি তবেই বলি-
তখন আমি গ্রামে থাকি, লক্ষ্মীপুর শহরে আমার লেখালেখির যত কান্ডকারখানা। আমার বাড়ি শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে।
তো একদিন কবিতার অনুষ্ঠান শেষে আমি ফিরছিলাম, কখন যে রাত বারোটা পেরিয়ে গেল বুঝে উঠতে পারিনি। সন্ধ্যে রাতে এক পশলা বৃষ্টি নেমেছিল বলে গ্রামীণ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। ঘন অন্ধকার, আকাশে কালো মেঘ ঝুলে আছে, যে কোনো সময় ঝরঝরে ঝরবে এমন। পিচ ঢালা রাস্তা ছেড়ে মেঠো পথে হাঁটছি। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ মনে হল পিছনে কে যেনো আসছে, চপ্পলজুতা পায়ের গোড়ালির সাথে বাড়ি খাওয়ার আওয়াজ আসছে কানে। ভাবলাম এলাকার মানুষ কেউ আসছে।
আমি সামনের দিকে হাঁটছি, একবার পিছনে তাকিয়েওছি । হাঁটছি আর পিছনে খেয়াল রাখছি শব্দটার দিকে। হঠাৎ খেয়াল করলাম শব্দটা আমার ডান পাশ দিয়ে আমাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। আমি পাশের দিকে তাকালাম, মোবাইলের টর্চ লাইট উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করি, কিছুই দেখলাম না। পেছনে তাকালাম, না কেউ নেই, মনে হলো- রাস্তায় যে পরিমাণ কাদাপানি তাতে অন্ধকারে মানুষ কিছুতেই এত জোরে হাঁটতে পারবে না। খালি পায়েও না। আমি নিজেও তো খুব ধীরে ধীরে যাচ্ছি। পাশ কেটে তাহলে আমাকে ওভারটেক করে কি গেল?

২.
কাজিম উদ্দিন এর বাড়ির সামনের মসজিদের মিনারে এনার্জি বাল্ব জ্বলন্ত, বহুদূর থেকেও আলো দেখা যায় ক্লিয়ার ভাবে। আমি মসজিদের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। মসজিদের জানালার গ্লাস থেকে আলো বের হচ্ছে চোখের পলকে দু-তিনবার। আমি আড় চোখে ক’বার তাকিয়ে সোজা হাঁটতে থাকি। আমি ভাবলাম কেউ হয়তো নামাজ পড়ছে।উঁকি দিয়ে দেখছি মসজিদ শূন্য, ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে আর একটা হালকা রুম বাতি জ্বলছে। মসজিদ ফেরিয়ে কুড়ি হাত অর্থাৎ বাড়ি ঢোকার রাস্তার মুখে আসতেই পিছন থেকে একটা ঢেলা এসে ঠিক আমার গায়ে না পড়ে ডান পাশ দিয়ে সামনের দিকে গিয়ে পড়ল। ভাবলাম নারকেলের টরি পড়লে তো উপর থেকে নিচে ফুড়বে, কি কিন্তু ঢেলা পিছন থেকে সামনে গেল কেন?
শরীর ভার হয়ে গেল। কিছুদূর সামনেই মসজিদ কমিটির সভাপতি হিরুর গরুর খামার। অন্যান্য দিন খামারের কোণে বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়, আজ আর তা নেই। খামার বরাবর না আসতেই গরু গুলো সব সমস্বরে হাম্বা হাম্বা চিৎকার করতে থাকলো। আমি নিশ্চিত হলাম কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে চলেছে। জোরে জোরে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। আবার হিরু হিরু করেও ছেঁচাই। কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই। গরুর খামারের দক্ষিণ পাশের গাছগুলো অস্বাভাবিকভাবে দোল দিচ্ছে। আশ পাশের গাছগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

হিরু কদিন আগেও একটা ঘটনা বলেছিল -রাতের বেলা তাদের খামারের গরুর দুধ চুরি হয়। যেদিন বোঝাপড়ার মধ্যে থাকে সেদিন দুধ পায়। বেশীর ভাগ সময়ই দুধ চুরি হয়। একদিন তারা তিন ভাই আর তাদের বাপ মিলে বুদ্ধি করে পাহারা বসায়। ঝকঝকে চাঁদের আলো, খামারের বাতি সব নেভানো। কেউ খামারের কাঁড়ে,কেউ পূর্ব পাশে নারকেল গাছের গোড়ায় বসা, কেউ পশ্চিম পাশে রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে, বাপ ঘরের দরজা খুলে বসে আছে। দখিনের খোলা বিল, রাত বারোটা ছাড়িয়ে গেছে। হঠাৎ তাদের একজন দেখলো এক মহিলার লম্বা চুল ছড়ানো পীঠে, ধবধবে সাদা শাড়ি পরা, বিল থেকে সোজা বালতি হাতে খামার ঘরে ঢুকলো। এমন সময় তারা চারজন চারদিক থেকে ক্রমশ এগিয়ে এলো খামারে, হঠাৎ করে বাতি জ্বালিয়ে দিতেই এক ধবধবে সাদা বিড়াল পূর্ব দিকে পালিয়ে গেল। কোথায় বালতি? কোথায় মহিলা?

এসব কথা তখনই মনে পড়ে গা কাঁপতে লাগলো পা যেন আর চলতে চায় না। আল্লাহ কি যে করি! ওমা সেকি সত্যি সত্যিই একটা বড় বিড়াল পাশ হয়ে হিরুদের ঘরের দিকে চলে গেল। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। ভাবতে পারছিনা কি করবো। মোবাইল ঘাটছি বাড়িতে জানিয়ে এগোতে বলি, কিন্তু নেটশুণ্য মোবাইল। সে কি!

৩.
আমি গান প্রিয় মানুষ, রাস্তায় একা চলতে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই। আকাশ একদম পরিষ্কার, চাঁদের আলো এত প্রকট যেন পত্রিকা পড়া যায়। আমি হাঁটছি তো হাটছি, বহু দূর থেকে দেখতে পেলাম কে যেনো যাচ্ছে আমার আগে। সাদা জামা পরা, আমি অতশত কিছু না ভেবে গান গাইতে গাইতে আসছি। মনে হলো লোকটা রাস্তার উপরেই গাছের আলো ছায়াতে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তারপর থেকেই তাকে ফলোআপ করছি। ভাবলাম চোরটোর হবে হয়তো! সে কিছুদূর গিয়ে রাস্তায় এক পাশে বড় একটা রেইনট্রি গাছের তলে দাঁড়িয়েছে। আমি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে হেঁটে আসছি। অনুমান হলো তার নড়াচড়া বন্ধ করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকল। আমি দেখতে দেখতে কাছে এসে দেখি, কে যেন সুপারি গাছের খোল ঝুলিয়ে রেখেছে। মোবাইলটা উঁচিয়ে ধরে নিশ্চিত হলাম যে এটা খোল।

এতক্ষণ যে লোকটা সামনে সামনে এলো সে কোনদিকে গেল? সামনে রাস্তা ফাঁকা, ডানে-বামে কোনো দিকে নামলেও দেখতে পেতাম কারণ বিলের মাঝখান দিয়ে রাস্তা হয়ে গেছে। তাহলে আমি কি দেখলাম?

৪.
আমার বয়স তখন ষোল কি সতেরো। সাব-দী মাঝির দিঘির পাড়ে কাজল, নাসির ও আমি গল্পগুজব কথাবার্তা সেরে বাড়ির দিকে একাই রওনা করলাম। রাত অনুমান সাড়ে ১১ কি ১২ টা বাজে। অনুমান এজন্য যে তখন কোন মোবাইল ছিল না, হাতঘড়িও দু এক জনের কাছে ছিল। আমার বাড়ি আর দিঘির মাঝখানে একটা খাল ছিরে গেছে। খালটারও সুন্দর নাম- চন্দনা। আমরা চলাচলের জন্য সে খালে বাদ দিয়ে রাস্তা বানিয়েছি। আমি দূর থেকে লক্ষ করলাম, বাঁধের উপর কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে আসতে দেখে সে পিছনের দিকে হাঁটছে। তখন রাস্তার কিনার একটা হরিৎ গাছ ছিল। সব দিকে সব পরিস্কার ঝকঝকে চাঁদের আলো, দূর বহুদূর দেখা যায়। আমি দেখলাম সাদা জামা লোকটা আমাকে ভয় দেখানোর জন্য হরিৎ গাছের নিচে বসে পড়ল। আমি লাফ দিলাম হরিৎ গাছে পড়লাম। আমাকে ভয় দেখানো? না তো, কারো গায়ে আমি পড়িনি। ওই তো সাদা জামা লোকটা বাঁশঝাড়ের দিকে যাচ্ছে। আমি ওর পিছু পিছু বাঁশঝাড়ের দিকে গেলাম। না তো কোন বাঁশে তো উঠেনি। সব ত্যাগ করে তাকে খোজ করতে লাগলাম। আর সজোরে মুখে বলতে লাগলাম আমাকে ভয় দেখানোর মজা আজ তো তোকে দেখাবো, কই তুই।

পরে তার কোনো হদিস না পেয়ে রাস্তার উপর এসে আমার গায়ের জামা খুলে লুঙ্গীর মধ্যে ভরে সুপারি গাছের গোড়ায় বসে থাকি। সে যেই হোক বের হবে, বের হলে ঘাড় মটকাবো, আমাকে ভয় লাগানোর অপরাধে।

প্রায় দুপুর রাত হয়ে গেল। কোনো দিক হতে বের হলো না সে। বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি মা কেরোসিনের বাতি হাতে করে ঘরের দরজা দিচ্ছেন, আমাকে খুঁজতে বের হচ্ছেন। তাহলে কে বাঁধের উপর দাঁড়ালো? কে সে হরিৎ ঝোঁপে লুকালো? কে বাঁশঝাড়ের দিকে হেঁটে গেল?

এসব প্রশ্নের উত্তর কখনোই হয় না। আমি এইরকম ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি বহুবার। আমাদের বাড়ি গ্রামে হওয়াতে আমরা প্রায় রাতে ভূতের আলেয়া, পায়ে ঘুঙ্গুর বাঁধা ঘোড়া যাওয়ার শব্দ, গলায় ঘন্টি বাঁধা হাতি যাওয়ার শব্দ কিবা মাথার উপর দিয়ে পানির মতো ঝরতে ঝরতে ছুটে যাওয়ার শব্দ শুনি। মাঝে মাঝে আমাদের মোবাইলের নেটওয়ার্কও খেয়ে ফেলে তারা।

কিন্তু তারা কে? তারা আমাদের সাথে এতো দুষ্টুমি, মশকরা করলেও আমরা তাদেরকে দেখতে পাইনা কেনো?

অ আ আবীর আকাশ: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
চন্দনকুটির,১২আগস্ট ২০১৬
abirnewsroom@gmail.com

24 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে