ভালোবাসার আহ্বান, কাজী জহিরুল ইসলাম

0
1074

ফাইয়াজ ইসলাম ফাহিম নামের এক তরুণ একদিন আমাকে ইনবক্সে বার্তা পাঠিয়ে জানায়, আমরা একটি সংগঠন করেছি, বাংলাদেশ লাভ অর্গানাইজেশন, আপনাকে আমাদের সভাপতি করতে চাই। আমি বেশ বিচলিত এবং কিছুটা বিব্রত বোধ করি। বিব্রত এজন্য যে ভালোবাসার আহ্বান আমি কি করে ফিরিয়ে দিই। আমার কিছু দাপ্তরিক সীমাবদ্ধতা আছে, ইচ্ছে করলেই আমি কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদ অলঙ্করণ করতে পারি না। ভেবে-চিন্তে খুব সাবধানে ফাইয়াজকে কথাটা জানালাম। কিছুদিন পর আবার বার্তা, স্যার, আপনি তাহলে প্রধান উপদেষ্টা হন। আমি দেখলাম ও নাছোড়বান্দা, আমাকে এর সঙ্গে রাখবেই। বেশ ক’দিন চুপ করে ছিলাম, মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে ও কমিটি করে ফেলে এবং ঘোষণা দিয়ে দেয় সংবাদ মাধ্যমে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার ছবিসহ সংবাদ ছাপা হয়েছে, আমি বিএলও-র প্রধান উপদেষ্টা। একদল তরুণ একসঙ্গে হয়ে ভালোবাসার জন্য কাজ করছে, এই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বানকে ফিরিয়ে দিই এমন সাধ্য আমার নেই। নিউজটি দেখে নিউ ইয়র্কের দুয়েকজন বন্ধু আমাকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন। একদিন আস্তে করে আমার স্ত্রী বলেন, তোমার ভালোবাসা কেমন চলছে?
ফাইয়াজ আমাকে মাঝে মাঝেই ইনবক্সে নক করে। সংগঠনের কর্মকান্ডের কথা জানায়। আমি খুব নিবিড়ভাবে ওদের কাজ-কর্ম, বার্তা আদান-প্রদান পর্যবেক্ষণ করি। ওদের বার্তা বিনিময় দেখে আমি দুটি বিষয় শনাক্ত করি। প্রথমত ওরা ইংরেজিটা শিখতে চায়, এই তৃষ্ণা থেকেই সংগঠনের নাম ইংরেজিতে রেখেছে এবং প্রথমদিকে গ্রুপচ্যাটে ইংরেজিতে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টাকে আমি স্বাগত জানাই এবং সাথে সাথে এ-ও বলি, তোমরা বাংলাটাও পাশাপাশি ভালো করে শেখো। কেননা একজন মানুষ যদি তাঁর মাতৃভাষায় স্বচ্ছন্দ হতে না পারে তাঁর ভাষাজ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারো যদি দেশ না থাকে সে কখনো আন্তর্জাতিক হতে পারে না। দ্বিতীয় যে জিনিসটি আমি শনাক্ত করেছি তা হচ্ছে, ওরা ভালোবাসার অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে চায়। তবে আমার মনে হয়েছে ওরা ভালোবাসা বলতে তরুণ-তরুণীর চিরায়ত প্রেমকেই প্রাধান্য দিয়েছে। একটি মেয়ে একটি ছেলেকে বা একটি ছেলে একটি মেয়েকে তার নিজের ইচ্ছায় পছন্দ করবে, ভালোবাসবে, বিয়ে করবে, এখানে অভিভাবক বা সমাজ যেন বাঁধা না দেয়। খুবই সঙ্গত দাবী। এই দাবী আমাদের মত পশ্চাদপদ সমাজে দীর্ঘদিনের দাবী। শ্রেণি-বৈষম্য, ধর্ম-বৈষম্য, বর্ণ-বৈষম্য, বিত্ত-বৈষম্য পশ্চাদপদ সমাজে দুজন মানুষের মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ এবং অভিভাবকের অন্যায্য খবরদারীর কারণে বাংলাদেশের বহু তরুণ-তরুণীর প্রাণ অকালে ঝরে গেছে, স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে কোটি মানুষের। একজন মানুষ তাঁর বিবেক-বিবেচনা প্রয়োগ করে স্বাধীন জীবনযাপন করবে, তাঁর ভালোবাসার স্বাধীনতা থাকবে, কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে, লেখার স্বাধীনতা থাকবে, সর্বোপরি একজন মানুষ কীভাবে তাঁর জীবন পরিচালনা করবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহনের স্বাধীনতা তাঁর থাকবে, এটিই সভ্য সমাজের প্রত্যাশা। আমি শুধু ওদেরকে এইটুকু বলতে চাই, তোমরা ভালোবাসার পরিধিটা বাড়িয়ে দাও। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করো, তাহলে বিএলও, বিশ্বমানবতার যে বিশাল ক্যানভাস, সেখানে একটি দাগ আঁকতে পারবে।

২০১৯-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে, ওরা নির্ধারণ করেছে বড়সড় কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির ব্যাপক আত্মপ্রকাশের। এটি খুব বিচক্ষণ এবং পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। ফাইয়াজের মধ্যে অস্থিরতা আছে, কিন্তু বেশ সময় নিয়ে আত্মপ্রকাশের এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তটি ওর পরিপক্কতা এবং ধৈর্যশীল মনেরও পরিচয় দেয়। আমি বারবার ফাইয়াজের নাম এজন্য নিচ্ছি যে এখনো পর্যন্ত বিএলও নিয়ে যত কথাবার্তা হয়েছে তার প্রায় সবই ফাইয়াজের উদ্যোগে, তাগিদে হয়েছে। সে-ই একমাত্র সরব অংশগ্রহণকারী এবং এই সংগঠনের উদ্যোক্তা। অন্যরা কিছু বলে না কেন, এজন্য তাকে প্রায়শই উদ্বিগ্ন হতে দেখি, মাঝে মাঝে অন্যদের প্রতি সে উষ্মাও প্রকাশ করে থাকে। ফাইয়াজকে আমার কাছে মনে হয় একটি ঝড়। ওর মধ্যে যে কর্মস্পৃহা আছে তা যদি সে ধরে রাখতে পারে আর পড়াশুনা করে নিজেকে তৈরী করতে পারে তাহলে একদিন ওকে দিয়ে বড় কোনো কাজ হবে। হয়ত এই বিএলও-ই একদিন বিশ্বমানবতার সপক্ষে পৃথিবীর মানুষকে একটি প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করাতে পারবে।
মানুষ কীভাবে মানবিক হয়ে উঠবে, কীভাবে একজন মানুষ অন্য মানুষকে ভালোবাসবে, কীভাবে মানুষের মানবিক বোধ জেগে উঠবে, এসব বিষয় নিয়ে বিএলও-র সদস্যদের ভাবতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচী তৈরী করে নিজেরা প্রশিক্ষিত হতে হবে, চর্চা করতে হবে। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে, যৎসামান্য পড়াশোনা দিয়ে, আমি যা শিখেছি তা এখানে উল্লেখ করতে চাই। ভালো মানুষ বা মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার জন্য তিনটি ধাপের কথা এখানে উল্লেখ করছি। প্রথমত, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাউকে আঘাত করা যাবে না। শারীরিক, মৌখিক বা লিখিত কোনো ধরণের আঘাত/আক্রমণ করা যাবে না। নিজেকে এই পর্যায়ে উন্নীত করতে পারলে একজন প্রাথমিক পর্যায়ের ভালো মানুষ হওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধস্পৃহা থেকেও কাউকে আঘাত/আক্রমণ করা যাবে না, তবে আত্মরক্ষার জন্য যা করার তা করা যাবে। দ্বিতীয় পর্যায়টি বেশ কঠিন। কেননা, আমাকে কেউ আঘাত করলে আমি তাকে প্রত্যাঘাত করবো না, এই রকম মনের জোর অর্জন করা বেশ কঠিন। তবে সঙ্গত প্রতিবাদ করা যাবে। কেউ যদি মিথ্যা অপবাদ দেয়, তার প্রতিবাদ করা যাবে। কেউ যদি জুলুম করে তার প্রতিবাদ করা যাবে। প্রতিবাদ আর প্রত্যাঘাত এক নয়, এটা ভালো করে লক্ষ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, অন্যের জন্য কাজ করার বা অন্যের উপকার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এমন হতে পারে, পরিকল্পণা করে মাসে একজনের উপকার করলাম, বা সপ্তাহে এক ঘণ্টা অন্যের জন্য কাজ করে দিলাম। এভাবে শুরু করা যেতে পারে এবং এই অভ্যাস গড়ে উঠলে একসময় দেখা যাবে যে আমার যখনই সুযোগ আসছে তখনই কারো না কারো উপকার করছি। এই উপকার একটি শেকল-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। প্রকৃতপক্ষে সকল মানুষই যুক্ত, আমরা কেউই বিচ্ছিন্ন নই। আমরা সবাই এক বৃহৎ সত্ত্বার ভগ্নাংশ মাত্র। সকলে মিলেই একটি পূর্ণ সত্ত্বা। এই বোধগুলি বিএলও-র সদস্যদের মধ্যে ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট করে তুলতে হবে। সমাজের আর দশজন মানুষের ভিড়ে আমরা যেন বিএলও-র সদস্যদের আলাদা করে চিনতে পারি, আমরা যেন প্রকৃত মানবিক হয়ে উঠি, আমরা যেন চন্ডিদাসের সেই কবিতার মত হৃদয় থেকে প্রতিনিয়ত উচ্চারণ করি, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই’ তবেই ‘ভালোবাসা’র অমীয় বাণী আমরা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবো।
ভালোবাসার জয় হোক।

হলিউড, নিউ ইয়র্ক। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে