গ্রামীণ অর্থনীতিকে আধুনিক করা প্রয়োজন

0
132

জিসান তাসফিক-
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আবার বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। অবশ্যই ষড়ঋতুর এই বৈচিত্র্যময় দেশে দুটো কথায় সত্য এবং একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। প্রাচীনকাল থেকে এদেশে গোলা ভরা ধান চাষ আর পুকুর ভরা মাছ চাষ থেকে মাছ আহরণ করে আসছে।

কালের বিবর্তনে এসব আগের মত নেই। ১৯২০ সালের বঙ্গদেশ আজ ২০২০ সালে বাংলাদেশ হয়েছে। তেমনি তখনকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন পরিবর্তিত হয়েছে। আগে দেশে এত কলকারখানা ছিল না। এত আমদানি রপ্তানি ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের ফলে তার যে ফলাফল এসেছে তা এখন বাংলাদেশে চলমান রয়েছে।

গ্রামীন অর্থনীতি হল এমন এক অর্থনীতি যেখানে গ্রাম থেকে উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু বর্তমানে করোনা মহামারি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার শক্ত অবস্থানকে দূর্বল করছে। বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ঢাকা, পাশাপাশি বৃহৎ কল-কারখানাগুলো গাজিপুর আর নারায়ণগঞ্জ গড়ে উঠেছে। এছাড়া চট্টগ্রামসহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এ সকল কলকারখানা দেশের অনেক মানুষকে দিয়েছে কর্মসংস্থান, দেশকে দিতেছে বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মূদ্রা ও রাজস্ব আয়।

কিন্তু এই মহামারীতে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান গিয়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের। এইসব খেটে খাওয়া শ্রমিকদের হাতে কাজ নেই। কথায় আছে অভাবে স্বভাব নষ্ট। কর্মসংস্থানের অভাবে এরা দেশের বিপদগামী হতে পারে। আবার দেশের উপর আছে দশ লক্ষ রোহিঙ্গার আর্থিক চাপ। কতদিন বিদেশীরা সাহায্য করে বলা যায় না আসলে নিত্য মরাকে কেউ মারে না। এখন সরকারের উচিত নতুন করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো।

দেশ যখন এত উন্নত ছিল না, তখন এই দেশে না না ধরনের শিল্প ছিল, যা এখন বিলুপ্ত প্রায়। তার মধ্যে অন্যতম রেশমি সুতা, তাত শিল্প, পাট শিল্প ইত্যাদি। পাটকে আমাদের দেশে সোনালী আঁশ বলা হত। আগে এগুলো ঘরে বানানো যেত। এছাড়া সরকারের উচিত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে মনোনিবেশ করা। দেশের যুব সমাজ এই প্রকল্পে যথেষ্ট অজ্ঞ যার জন্য তারা উদ্যোক্তা না হয়ে চাকুরীর পিছনে ছোটে। অবশ্যই অর্থের অভাব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভীত। আর সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে অত চাকরি নাই যতটা বেকার আছে। এর মধ্যে আবার করোনা মহামারীতে শ্রমিক ছাটাই হল।

এই যুব সমাজকে নিয়ে উচিত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প সহ নানা প্রকল্প করে তা বাস্তবায়ন করা। শুধুমাত্র যুবকদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সহ প্রশাসন তথা সরকার এক বড় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। যাতে করে খামার থেকে উৎপাদিত পন্য বাজারজাত করণ থেকে শুরু করে আমদানি রপ্তানি সহ সকল ব্যবস্থা সরকার পরিকল্পিত করে করতে পার, এত মানুষ উৎসাহিত হবে । কারণ একটি রাষ্ট্রের উপাদান হল জনগণ আর জনগণের সার্বিক দেখভাল করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব ।

বিদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। গেলে যায়তো বৈদেশিক মূদ্রাই। শ্রমিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রমে ধনীরা যে মুনাফা অর্জন করে সেটা যদি বাহিরেই পাচার হয়ে যায় তবে দেশের কি থাকে? আবার দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারকে বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক, চীন সহ নানা দেশের কাছে থেকে ঋন নিতে হয়, এর জন্য তাদের নানান শর্ত সরকারকেই পূরণ করতে হয় আর দীর্ঘ মেয়াদী সুদের বোঝাতো আছেই।

সরকার চাইলে নবীন উদ্যোক্তাদের পিছনে পাচার কৃত অর্থ খরচ করতে উৎসাহিত করতে পারে। এই ক্ষেত্রে সরকার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। ধনীরা যাতে তাদের বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত ও তা দিয়ে লাভ অর্জন করতে পারে তার জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা ও অর্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মানুষ আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হলে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রেরই লাভ আসে। হাস মুরগির খামার, গরুর খামার, পুকুর মাছ চাষ, সমন্বিতভাবে খামার করা, গ্রামে বিভিন্ন জায়গা ছোট ছোট কারখানা স্থাপন করা, ঘরে ঘরে হস্ত ও প্রযুক্তি শিল্প প্রতিষ্ঠা করা ।

এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। ভালো ইন্টারনেট সেবা পেলে কোনো এক মেধাবী ও শিক্ষিত যুবক দিনে খামারে কাজ করে রাতে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করল। তার পরিবার পাশে থেকে তাকে সহায়তা ও করতে পারবে। সরকারের প্রয়োজন উৎসাহ দেওয়া ও সহযোগিতা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাতে এভাবেও উৎসাহিত করা যায়। এতে করে গ্রাজুয়েট যুবকেরা আর চাকুরী চিন্তায় হতাশা হবে না। আবার ঢাকার প্রতি জনসংখ্যার ও চাপ কমবে। ছাটাই হওয়া শ্রমিকদের ও এদের সাথে কাজ করেও নিজের পরিবারকে দারিদ্র্যতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। মূল কথা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে জাগিয়ে তোলা। এছাড়াও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সরকার যে অর্থনৈতিক অঞ্চলের তৈরি করতেছে তার জন্য জনগণকেও উপযুক্ত করা।

সর্বশেষ জাতীয় (২০২০-২১) বাজেটে মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ। এই বাজেটের টাকা সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যয় করবে। যার মধ্য যার মধ্যে সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৬৯ হাজার ৫৫৩ টাকা, সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP), বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বাবদ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। এই সকল অর্থ যদি গ্রামীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে দেয় তবে আশা রাখছি, পৃথিবীতে বাংলাদেশকে আর ঋণের বোঝা বইতে হবে না, থাকবে না কর্মসংস্থান সংকট, বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম স্বাবলম্বী দেশ হিসেবে আমরা দেখতে পারব।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply