একুশ শতকী বিপর্যয়ে ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতি

0
89

এই গ্রহটি ধ্বংস হওয়ার রব মাঝে মাঝেই শোনা যায়। গত ২০ বছরে সব থেকে আলোচিত দুইটা সংবাদ ছিল ২০০০ এবং ২০১২ সালের পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যৎ বাণী। কিছু কিছু লোক তা নিয়ে মাতামাতি করলেও তার প্রভাব ছিল নগণ্য। তবে পৃথিবীর ধ্বংস নিয়ে হলিউড যতগুলো সিনেমা তৈরি করেছে তা এ সংক্রান্ত ঝুঁকির ঘটনা থেকে অনেক বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অনেক বারই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা এসেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত না হলেও পৃথিবীকে আতঙ্কিত করার মতো ঘটনা কম ছিল না। দেশে দেশে যুদ্ধ, চেরনোবিল দুর্ঘটনা, সোভিয়েত বনাম যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধ, অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সুনামির মতো ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পরে বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, পররাষ্ট্র এবং সামাজিক ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন চলেছে। সঙ্গে আরব বসন্ত ছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রে বড় বিপর্যয় হয়েছে। এ ঘটনাগুলোর কোনোটাই সারা বিশ্বকে এক যোগে সম্পৃক্ত করেনি। ঘটনাগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। কোনো একটা দেশে বা কোনো একটা অঞ্চলেই শুধু আক্রান্ত করেছে। বিগত বছরগুলোতে সারা বিশ্বকে সম্পৃক্ত করার মতো সম্ভবত একটাই ঘটনা ছিল সেটা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী তারা এটা অস্বীকার করে এসেছে। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা বুঝতেই পারেনি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে বোঝা কঠিন।
তবে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বকে এক যোগে আতঙ্কিত করতে পেরেছে একমাত্র করোনা ভাইরাস এবং এর দ্বারা সংঘটিত কোভিড-১৯ রোগ। ধনী থেকে দরিদ্র সকলেই এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে অতি সাধারণ মানুষ কেউই করোনা ভাইরাসের থেকে নিরাপদ নয়। সে মানেনা কোন সীমান্ত, বুঝেনা কোন সীমানা, সুযোগমত সবাইকেই এটি সাদরে নিমন্ত্রন করে নেয় অতি সহজেই।
সারা বিশ্বের অর্থনীতি হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়েছে। বিনোদন জগৎ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে শুধু ইন্টারনেট। খাদ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটনায় খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে। শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষেরা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মাত্রা এতটাই যে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিদিনই পরিসংখ্যানের খাতায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন আয়ের মানুষেরা সব থেকে বিপদে পড়বেন। কারণ তাদের পাশে ধনীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব না। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষেরা অর্থনৈতিকভাবে সব থেকে বিপদে পড়বেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই এই মহামারি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেবে। কারণ তখন আক্রান্ত না হয়েও খাদ্য বা চিকিৎসা সংকটে আরও অনেক মানুষ মারা পড়বেন। আর আমাদের মতো দুর্বল অর্থনীতি বা চিকিৎসা সেবার দেশে এই মহামারি কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা ভাবতে গেলেও শিউরে উঠতে হয়।
যে সমস্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্টিকে আর্থিক সহযোগীতা করে যাচ্ছে তাদের ও যেমনি দুর্ভোগ পোহাতে হবে তেমনি এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত দেশের বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের পড়তে হবে নিদারুন কষ্টে। যে মানুষগুলো দেশের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় পা দিতেও সাহস পায়না তাদের সাদরে গ্রহন করে নেয় মাঝারি ও ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এদের বাচিঁয়ে না রাখলে অর্থনীতি আরো ভেঙ্গে পড়বে। মানবজীবন আরো অতিষ্ট হয়ে উঠবে। তাই সরকারের উচিৎ যতদ্রুত সম্ভব তাদের পূর্বের ন্যায় কার্যক্রমে সহযোগীতা করা।
এই বিপর্যয় কত বিস্তৃত হবে বা কত দিন ধরে চলবে তা সময়েই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে সবার এক যোগে এগিয়ে আসতে হবে। এই এগিয়ে আসা মানে নিজেদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। নিজেরা যাতে এই ভাইরাসের বাহক না হয়ে যাই তার জন্য জন সমাগম এড়িয়ে চলা, নিজেদের গৃহবন্দী করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। আর একান্ত আক্রান্ত হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসাটা জরুরি।

Leave a Reply