কুষ্টিয়া জেলা দৌলতপুরে ভিজিডি কার্ডে চাউল পাচ্ছেন কারা!

0
571

মোঃ মাসিদুল ইসলাম, কুষ্টিয়া দৌলতপুর প্রতিনিধি কুষ্টিয়ার জেলা দৌলতপুর উপজেলা সংরক্ষিত আসনের একজন মহিলা ইউপি সদস্য নিজের নামেই করিয়ে নিয়েছেন দুস্থ নারীদের ভিজিডি কার্ড। আবার কার্ড ইস্যু করেছেন খোদ ইউপি চেয়ারম্যান। প্রাপ্ত অভিযোগে জানা যায়, দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য শারমিন সুলতানা ২০১৯ সালের ১১ মার্চ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের দেওয়া মাসিক ৩০ কেজি খাদ্যশস্যের (চাল) ভিজিডি কার্ড নিয়ম বহির্ভূত নিজ নামে করে নিয়েছেন। তার কার্ড নম্বর- ০৬।
এছাড়া তিনি এক ভিজিডি কার্ডধারীর কার্ড চার বছর ধরে নিজের কাছে রাখেন এবং তা দিয়ে চাল উত্তোলন করেন। তার বিরুদ্ধে অপর এক ভাতাভোগী নারীর এক বছরের চাল আত্মসাতেরও অভিযোগও উঠেছে। এই নিয়ে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। কোন জনপ্রতিনিধির নামে এ ভিজিডি কার্ড দেয়ার নিয়ম না থাকলেও তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজসে এভাবে কার্ড দিয়ে চাল উত্তোলন করে আসছেন। ইউপি সদস্য শারমিন সুলতানা’র প্রতিবেশী বৈরাগীর চর এলাকার জামাল সরদারের বয়স পঞ্চাশের বেশি। ২০১৬ সালে তার নামে খাদ্য অধিদপ্তরের সুলভ মূল্যের (ওএমএস) ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড ইস্যু করা হয়। তবে সে কার্ড চার বছর ধরেও হাতে পাননি, এবং এ সম্পর্কে তিনি জানতেনই না।
সম্প্রতি ওএমএস, ভিজিডি ও ত্রাণের বিষয়ে অনিয়ম ঠেকাতে সেনাবাহিনীর তৎপরতা শুরু হচ্ছে এমন খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল জামাল সরদারের বাড়িতে গিয়ে কার্ড বুঝিয়ে দিয়ে আসেন এই ইউপি সদস্য। জামাল সরদার বলেন, ‘চার বছর আগে ওএমএস এর কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি নিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন আমার কার্ড হয়নি। এর পর গত মাসের ১৫ তারিখ সকালে এসে আমাকে কার্ড দিয়ে গেছেন। চার বছর ধরে তিনি আমার কার্ড দিয়ে চাল তুলে নিয়েছেন।আমি এ ঘটনার বিচার চাই। মরিচা ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের জিয়ারুল ইসলামের স্ত্রী মানছুরা খাতুনের অভিযোগও একই রকমের। তার নামে ২০১৯ সালে ভিজিডি কার্ড হলেও হাতে পাননি তিনি। তার অভিযোগ, ১ বছর ধরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল ওঠানো হয়েছে তার নামের কার্ড থেকে। তার ভিজিডি কার্ডের নম্বর-০৪।
মানছুরা খাতুন বলেন, ‘২০১৯ সালে মহিলা মেম্বার শারমিন সুলতানা আমাকে ভিজিডি কার্ড করে দেয়ার কথা বলেন। তার কথা অনুসারে আমার ছবি এবং ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি দেই। এরপর কার্ডের জন্য বহুবার ইউনিয়ন পরিষদে গেলেও কার্ড হয়নি বলে জানিয়ে দেন চেয়ারম্যান শাহ আলমগীরসহ পরিষদের অন্য সবাই। তবে তার ওই কার্ডে গত ১২ মাস ধরে টিপসই দিয়ে ভিজিডির চাল তোলা হয়।’ সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে ১ বছর পর মানছুরা খাতুনের নামে ইস্যুকৃত কার্ডটি তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া স্বামী পরিত্যক্তা মোসাঃ নিলুফা ইয়সসমিন দুইটি শিশু বাচ্চা নিয়ে পিতৃালয়ে আছে, তার ২০১৯-২০২০ আক্রের ভিজিডি কার্যক্রমে ২ নং সিরিয়ালে থাকলেও দীর্ঘ ১৫ মাস কোন খাদ্যাশস্য পায় নি। বিষয়টি বার বার চেয়ারম্যান কে জানানো হলেও তিনি বলেন “তাকে চাউল দেয়া হবে না”। চেয়ারম্যান নিজে এই চাউল আত্মসাৎ করে বলে মনে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সকল সদস্যই ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেদের নিকট আত্মীয় ও একই পরিবারের লোকজনদের কার্ড দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য শারমিন সুলতানা বলেন, ‘আমার নামে মহিলা অধিদপ্তরের ভিজিডি কার্ড রয়েছে। আমি নিয়মিত চাল পাই। আমি অসহায় এবং বিধবা নারী, আমার উপরে চেয়ারম্যানের নেক নজর আছে। তাই সে কার্ড করে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কিছু মানুষ চক্রান্ত করছে। আমার বিরুদ্ধে তারা মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য নয়ন আলী জানান, গত কয়েকদিন আগে জামাল সরদারকে এক বস্তা চাল আর কার্ড দিতে যান এই মহিলা ইউপি সদস্য।এসময় জামাল সরদার কার্ডটিতে একাধিক টিপ স্বাক্ষর দেখে কার্ডটি নিতে অস্বীকার করেন। এনিয়ে এলাকায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, তিনি নিজের স্ত্রী, মা, বোনসহ নিকট আত্মীয়দের নামে ভিজিডি ও ওএমএস এর কার্ড করেছেন। অভিযোগ স্বীকার করে নাসির উদ্দীন বলেন, ‘আমার ভাই, ভাইয়ের বউ এর নামে ভিজিডি কার্ড আছে। তবে আমার নামে নেই। আমার পরিবারে তিনজনের নামে কার্ড রয়েছে আমার স্ত্রী, আমার মা এবং আমার বিধবা বোন। চেয়ারম্যান ভাগ করে দিয়েছিল, আমরা সেগুলো করে নিয়েছি।’
এ ব্যপারে জানতে চাইলে মরিচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ-আলমগীর বলেন, ‘মহিলা ইউপি সদস্যের নামে ভিজিডি কার্ড করা যাবে কিনা সেটা আমাদের জানা ছিলো না। অনেক মেম্বাররাই সে সময় না বুঝে এমনটি করেছে।’ জনপ্রতিনিধির নামেই খোদ ভিজিডি কার্ড কিভাবে হলো তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মহিলা অধিদপ্তরের বিষয়। যদি নিয়মে না থাকে তাহলে তারা অনুমোদন দিলো কি করে। তারা বাতিল করে দিতে পারতো।’ তিনি বলেন, ‘এই ইউনিয়নের অধিকাংশ মেম্বারই গরীব। এদের এসব নিয়ম-অনিয়ম দেখতে গেলে প্রায় সকলেরই সমস্যা হয়ে যাবে। খুঁজতে গেলে প্রায় সবাই ফেঁসে যাবে। যেমন ২ নম্বর ওয়ার্ডের নাসির মেম্বারের ৪টা ভিজিডি কার্ডের মধ্যে ৪টাই তার পরিবারে। তার স্ত্রী, মা, ভাবির নামে ও বোনের নামে। আমার ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বারের ছেলের বয়স ১০ বছর। কিন্তু তার স্ত্রী মাতৃত্বকালীন ভাতা তোলেন।তার ভাবির নামেও করেছেন কার্ড। এমন অনেক আছে। আরেক অভিযুক্ত ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহ আলম এর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। দৌলতপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ইশরাত জাহান বলেন, ‘কোনো জনপ্রতিনিধি অথবা সরকারি কর্মচারী নিজ নামে ভিজিডিসহ এ ধরনের কার্ড ইস্যু করার নিয়ম নেই। যতই অসচ্ছল হোক এটি আইনসম্মত নয়। আমাদের নির্দেশনা দেওয়া ছিল, যেন এ ধরনের অনিয়ম না করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু বলার নেই। যদি কেউ অনিয়ম করে, তা প্রমানিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে