চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কে গণপরিবহন সংকটে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে

0
824

আামেনা বেগম। কোলে প্রায় এক মাস বয়সী শিশু। গত এক সপ্তাহ ধরে তার শিশু সন্তানটি ঠা-াজনিত সমস্যায় ভুগছেন। ফরিদগঞ্জ স্বাস্থ্য কমেপ্লঙ্রে শিশু চিকিৎসককে দেখালেও কোনো উন্নতি না হওয়ায়, চাঁদপুরে শিশুটিকে নিয়ে যান শিশু চিকিৎসক সুজিত কুমার দাশের কাছে। সকালে গিয়ে তার শিশুটিকে দেখিয়ে ও পরীক্ষা শেষে যখন বাড়ি ফিরবেন তখন মাগরিবের আজান দেয়া হয়ে গেছে। চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেটের সামনে থেকে একটি সিএনজি অটোরিঙ্ায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে উঠলেও চাঁদপুর শহরের ছায়াবাণী মোড়, বাসস্ট্যান্ড ও ওয়্যারলেস মোড়ে প্রায় ঘন্টা খানেক বসে থাকতে হয়েছে। ছোট্ট ও অসুস্থ শিশুটির কথা চিন্তা করেনি সিএনজি অটোরিঙ্ার চালক। নিজের ইচ্ছে পূরণ অর্থাৎ পরিপূর্ণ যাত্রী নিয়েই ফরিদগঞ্জের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছেড়েছেন। কিন্তু চাঁদপুর থেকে যদি একটি নির্দিষ্ট সময় (১০ মিনিট বা ৫ মিনিট, যা অন্য জেলাগুলোতে দেখা যায়) গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আমেনা বেগমকে ছোট্ট এই অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে ঘন্টাকালেরও বেশি সময় ধরে বসে থাকতে হতো না।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মোঃ শাহজাহান গত ১৫ বছর ধরে পার্শ্ববর্তী জেলা লক্ষ্মীপুর চাকুরি করেন। নিয়মিত বাড়ি থেকে গিয়ে অফিস করেন। পরিবারের সঙ্গে থাকা এবং পরিবহন ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো থাকার কারণে প্রতিদিন তিনি অফিস করে যাচ্ছেন। এক সময় চৌমুহনী থেকে রায়পুর পর্যন্ত গণপরিবহন হিসেবে সার্ভিস দেয়া আনন্দ পরিবহন ও আধুনিক পরিবহন চাঁদপুর পর্যন্ত তাদের পরিধি বাড়ানোর কারণে তাঁর অর্থ ও সময় সাশ্রয় হয়েছিল। কিন্তু এখন তা গুড়ে বালি। তিনি বলেন, বর্তমানে বাস সার্ভিসগুলোকে পূর্বের তুলনায় তেমন একটা বেশি না দেখাতে আমরা দৈনন্দিন যাত্রীরা নানাভাবে হয়রানি এবং ভোগান্তিতে পড়ছি। এক সময় সড়কের পাশে দাঁড়ালে বাসে আরোহন করে গন্তব্যস্থলে যাওয়া যেত। এখন ফরিদগঞ্জ থেকে রায়পুর যেয়ে সেখান থেকে বাসে চড়ে লক্ষ্মীপুরে যেতে হয়।

এ ধরনের আরো বহু লোকজন রয়েছেন যাদেরকে গণপরিবহনের অভাবে অতিরিক্ত ভাড়া ও বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বছরের দুই ঈদের আগে ও পরে অন্তত ১৫ দিন সিএনজি স্কুটার চালকদের দৌরাত্ম্যে অসহায় থাকে যাত্রীরা। অন্য সময়গুলোতে সিএনজি স্কুটারের ফরিদগঞ্জ থেকে চাঁদপুর ১৭ কিলোমিটার সড়কর জন্যে জনপ্রতি যাত্রী ভাড়া ৪০ টাকা ও ফরিদগঞ্জ থেকে রায়পুর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার সড়কের জন্যে ৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারিত থাকলেও ঈদের সময় এই ভাড়া কয়েক গুণ হয়ে যায়। ঈদের আগে চাঁদপুর লঞ্চঘাট ও বাসস্ট্যান্ড থেকে জনপ্রতি যাত্রী বাড়া ১৫০/২০০/২৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়। আবার ঈদের পর ঊল্টো অবস্থার সৃষ্টি হয়। এভাবেই গত কয়েক বছর ধরে চলে আসছে। ঈদের পূর্বে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা সভায় ঈদ উপলক্ষে সিএনজি স্কুটারসহ অন্য পরিবহনের জন্য ভাড়া বাড়িয়ে নির্ধারণ করে দিলেও কেউই তা মেনে চলে না। এ বছর ঈদের এক সপ্তাহ পরেও সিএনজি স্কুটার ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে থেকে চাঁদপুরগামী যাত্রীদের থেকে জনপ্রতি ১৫০/২০০ টাকা এবং রায়পুরগামী যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০/৭০ টাকা হারে টাকা আদায়ের সংবাদ প্রশাসন ও থানা পুলিশ মনিটরিংয়ে গেলে সিএনজি স্কুটারগুলো উধাও হয়ে যাত্রীদের পরিবহন সংকটে ফেলে দেয়। পরে পুলিশ চলে গেলে তারা ফিরে এসে আগের মতোই ভাড়া নিতে শুরু করে। একই অবস্থা নামে মাত্র থাকা গণপরিবহনগুলোর।

এদিকে যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর সড়কে আনন্দ পরিবহনের কিছু সংখ্যক বাস ও বোগদাদ পরিবহনের কিছু বাস চললেও তাদের একটি বাস থেকে আরেক বাস ছাড়ার সময়ের দূরত্বের কারণে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে সিএনজি স্কুটারে চলছে। যাত্রীরা জানায়, বোগদাদ সার্ভিস আধ ঘন্টা পর পর এবং আনন্দ পরিবহনের সার্ভিসের একই অবস্থা। এই আধাঘন্টা সময়ের মধ্যেই একজন যাত্রী সহজে তার গন্তব্যে পেঁৗছতে পারে।

কিন্তু রায়পুর থেকে ৫মিনিট পর পর লক্ষ্মীপুর-চৌমুহনীর উদ্দেশ্যে আনন্দ ছেড়ে যায়। আবার চাঁদপুর থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে বোগদাদ সার্ভিস ৫ মিনিট পর পর ছাড়ছে। চাঁদপুর থেকে রামগঞ্জ উপজেলা পর্যন্ত বৈশাখী পরিবহনটি ছাড়ছে নির্দিষ্ট সময় পর পর। অথচ চাঁদপুর থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত সার্ভিসগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র। যদিও ভিন্ন কথা বলছেন এসব পরিবহনের ফরিদগঞ্জ অংশের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাবৃন্দ।

আনন্দ বাস মালিক সমিতির ফরিদগঞ্জের দায়িত্বে থাকা মাহবুব পাটওয়ারী জানান, চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে বর্তমানে যে যাত্রীবাহী বাসগুলো চলাচল করে আসছে, তার মাঝে এখন শুধু আনন্দ নামের কয়েকটি বাস রয়েছে। বাস মালিক সমিতি আর চালকদের কথানুযায়ী সড়কে পূর্বের ন্যায় যাত্রী সংখ্যা কম। তাই অনেক ক্ষেত্রে চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ সড়কে সচরাচর বের হয় না। লক্ষ্মীপুর থেকে চাঁদপুর লঞ্চঘাটের কিছু সংখ্যক যাত্রী রয়েছে যাদের নিয়েই এ সড়কে পথচলা। মাঝে মধ্যে বাসে যাত্রী সংখ্যা কম হলে এ সড়কে যাতায়াত বিলম্বিত হয়। আর এখানকার যাত্রীরা সে সময় ধরে অপেক্ষমান থাকতে নারাজ। তাই তারা সিএনজি স্কুটারযোগেই গন্তব্যস্থলে পাড়ি জমায়।

ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড যাত্রীবাহী বাস মালিক সমিতির দায়িত্বে থাকা আব্দুর রাজ্জাক রাজা জানান, চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস প্রয়োজানুসারে চলাচল না করার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুর সেতুর টোল আদায়। দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও এর টোল আদায় বন্ধ হয়নি। একটি যাত্রীবাহী বাস সড়কে চলাচল করলে মোটামুটি বড় সড় একটা খরচের হিসেব রয়েছে। রায়পুর থেকে চাঁদপুর সরকারি কলেজের অনেক শিক্ষার্থী এবং গৃদকালিন্দিয়া কলেজে ফরিদগঞ্জ ও রায়পুরের বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী বাসে আরোহন করে থাকে। সে হিসেবে তাদের নিকট অর্ধেক ভাড়া নিতে হয়। তাহলে কিভাবে যাত্রীবাহী বাস এ সড়কে চলাচল করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক দশক পূর্বে চাঁদপুর থেকে ফরিদগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ থেকে কুমিল্লা, ফরিদগঞ্জ থেকে চাঁদপুর হরিণা ফেরিঘাট, ফরিদগঞ্জ থেকে রায়পুর-লক্ষ্মীপুর, ফরিদগঞ্জ থেকে ঢাকা ও ফরিদগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম এবং ফরিদগঞ্জ থেকে খুলনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী বাস, মিনি বাস চলাচল করেছে। কিন্তু ক্রমশ এ যাত্রীবাহী বাসগুলো সড়ক থেকে ছিটকে পড়ছে । সড়কের দুরবস্থা, সার্ভিসের মান ও সড়কে ব্যাপক চাঁদাবাজিই এর উল্লেখযোগ্য কারণ। এখন যে কয়টা যাত্রীবাহী বাস রয়েছে তাও একেবারে নিম্নমানের সার্ভিস দিচ্ছে। বাসের অপেক্ষায় থাকতে গেলে যাত্রীদের কাজে বিলম্ব হয়। তাই একান্ত বাধ্য হয়ে সিএনজি স্কুটারযোগে গন্তব্যস্থলে পাড়ি দিতে হয়।

ফরিদগঞ্জ-লক্ষ্মীপুর সড়কের দৈনন্দিন যাত্রী মোঃ মাকসুদ খান জানান, দেশের সব স্থানে এক জেলা থেকে অন্য জেলাতে প্রবেশকালে হরেক রকমের যাত্রীবাহী বাস পাওয়া যায়। বাসের ভিতর চড়ে গন্তব্যস্থল পাড়ি দেয়ার মজাই আলাদা। স্বল্প সময় এবং কম খরচের মধ্যে ভ্রমণ করা যায়। আনন্দ আর আধুনিক বাস সার্ভিস এ সড়কে থাকাকালীন ফরিদগঞ্জ থেকে লক্ষ্মীপুরের যাতায়াত ভাড়া ছিল সাধ্যের ভিতরে। এখন সিএনজি স্কুটারের দখলে চলে যাওয়াতে ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়াও যাত্রীদের বিভিন্নভাবে ভোগান্তি হয়। চাঁদপুর থেকে যে কয়টা আনন্দ বাস সার্ভিস রয়েছে, সেগুলোর সেবার মান নিম্নমানের। বাসের সংখ্যা কম হওয়াতে চালকরা যাত্রীদের সাথে সুযোগে নানাভাবে হয়রানি করে থাকে। আর ৫০ কিলোমিটারের ঊধর্ে্ব সড়ক তো আর সিএনজি স্কুটারে পাড়ি দেয়া অনেক সময় অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে এ বাসের ভিড়ের মধ্যেই যেতে হয় গন্তব্যস্থলে। বর্তমানে যদি আনন্দ আর আধুনিক বাস সমিতি চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে চালানোর সুযোগ করে দেয় তবে যাত্রীরা বিভিন্নভাবে হয়রানি থেকে রক্ষা পাবে বলে ধারণা করা যায়।

অপরদিকে ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে চাঁদপুরে প্রবেশ করতে হলে একই ভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হয় যাত্রীদের-এমন অভিযোগতো হরহামেশাই রয়েছে। ঈদ অথবা অন্যান্য দিবস ছাড়াও নিত্যদিনই সিএনজি স্কুটার আর যে কয়টা যাত্রীবাহী বাস রয়েছে তাদের চালকের সাথে যাত্রীদের ভাড়া এবং সেবা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিরোধ যেন লেগেই থাকে। মোহাম্মদ রসু মিয়া নামের একজন সচেতন নাগরিক জানান, এর জন্য শুধুমাত্র যাত্রীবাহী বাহনের চালক অথবা সড়কের যাত্রীদের উপর দোষ চাপালেই হবে না, চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস সঙ্কটের কারণে চালক যাত্রীদের সাথে মাঝে মধ্যে ভাড়া সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয়। প্রয়োজন অনুসারে যদি ফরিদগঞ্জ থেকে চাঁদপুরে যাতায়াতের জন্য যাত্রীবাহী বাস পাওয়া যেত, তবে এ ধরনের সমস্যায় করোরই সম্মুখীন হতে হতো না।

সূত্র: চাঁদপুর কন্ঠ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে