ডায়াবেটিস ও খাদ্যে কুসংস্কার: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

0
914

একটি ভাবনা: মো: মাজহারুল ইসলাম
ডায়াবেটিস ও খাদ্যে কুসংস্কার: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস এখন দ্রুততম এবং মারাত্মক রোগগুলির মধ্যে অন্যতম। আর এটা এই জন্য বেশি ঝুকিপূর্ণ ডায়াবেটিকে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক দিন ধরে ডায়াবেটিকে আক্রান্ত হওয়ার পরও তিনি হয়ত জানেনই না তার সুগার সমস্যা রয়েছে। এমনকি এটাও বুঝতে পারেননি শারীরিকভাবে আস্তে আস্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে ডায়াবেটিকে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ডায়াবেটিকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে রোগী না বলে সুগারসমস্যাগ্রস্ত বললে সমাজে সাধারণ মানুষের মনে ততটা নেতিবাচক ধারণ সৃষ্টি হবে না। আন্তর্জাতিক ডায়াাবেটিস ফেডারেশনে ডায়াবেটিস অ্যাটলাসের মতে, বিশ্বের ৪১৫ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিস রোগে বা সুগারসমস্যায় আক্রান্ত। এই সংখ্যাটি ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৪২ মিলিয়নে উন্নীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী গড়ে ১১ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন ব্যক্তি সুগারসমস্যাগ্রস্ত (ডায়াবেটিস রোগী) এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) খরচের ১২ শতাংশই ডায়াবেটিকের গবেষণা ও চিকিৎসায় খরচ হচ্ছে। বুলেটিনে প্রকাশিত গবেষণার মতে বাংলাদেশের ৭.১ মিলিয়ন মানুষ সুগারসমস্যায় বা ডায়াবেটিকে আক্রান্ত। ২০৪০ সালে এর সংখ্যা ১৩.৬ মিলিয়ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমরা যদি একটু চিন্তা করি সহজেই আনুমান করতে পারি, বিষয়টি বাংলাদেশের মত দেশের জন্য কতটুকু ভয়াবহ হতে যাচ্ছে। আরো ভয়ের বিষয় হলো ডায়াবেটিস নিয়ে আমাদের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বা ৫১.২% মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। যারজন্য সুগার সমস্যাগ্রস্তদের মানুষদের অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা গ্রহণ করলেও শারীরিক চিকিৎসায় বেশ ফলপ্রসু দেখা যায় না।
আমাদের সমাজে ডায়াবেটিস নিয়ে রয়েছে ভ্রান্ত ধারণা। আর এই ভ্রান্ত ধারণাগুলো প্রচলিত হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। সমাজের সাধারণ মানুষের মাঝে এখনই সচেতনতা না করা হলে দিন দিন না জানার কারণে মহামারী আকার ধারণ করবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তারের ভূমিকা যতটুকু না গুরুত্বপূর্ন তার থেকে সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করা অধিক প্রয়োজন। আর তাতে সরকারের সাথে সাথে ভূমিকা রাখতে পারে বিভিন্ন স্বেচ্চাসেবক সংঘটন, এনজিও এমনকি সমাজসচেতন ব্যক্তিবর্গ। বিশেষ করে সমাজকর্মীগণ ডায়াবেটিকে আক্রান্তব্যক্তি বা তার পরিবারকে মানসিকভাবে কাউন্সিলিং করে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচকবাচক পবিবর্তন ঘটাতে পারেন।
আমাদের সমাজে সামাজিকভাবে সুগারসমস্যাটি নিয়ে যেমন রয়েছে বিভিন্ন কুসংস্কার ঠিক তেমনি সুগারসমস্যা সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা থাকলেও সুগারসমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির খাদ্যে রয়েছে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা। যতগুলো ভুল ধারণা রয়েছে তারমধ্যে ‘বেশী চিনি খেলেই ডায়াবেটিস হবে’ অধিক প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা। বলতে গেলে কথাটি পুরোপুরিভাবেই সত্য নয়। বেশ কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, বেশি চিনি খেলেই যে ডায়াবেটিস হবে তাও যেমন ঠিক নয় তেমনি কম খেলেই যে ডায়াবেটিস হবে না তাও ঠিক নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বেশি পরিমান চিনি খাবারের সাথে সুগারসমস্যা (ডায়াবেটিস) এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা জানি, আমাদের অগ্নাশয় বা পেনক্রিয়াস হতে ইনসুলিন নামক এক হরমোন নির্গত হয়। ইনসুলিনের কাজ হলো রক্তের সুগার বা চিনি কোষের ভিতর প্রবেশ করিয়ে থাকে, যাতে আমাদের শরীরের কোষে সুগার বা চিনি সঠিক পরিমানে বিদ্যমান থাকে। অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন উৎপাদন না হলে, কম উৎপাদন হলে অথবা একবারে উৎপাদন না হলে রক্তে সুগার বা চিনির পরিমান বেড়ে যায় যা আমাদের কাছে সুগারসমস্যা (ডায়বেটিস রোগ) নামে পরিচিত।
যদিও বর্তমানে বেশকিছু উন্নত দেশের গবেষণায় দু’ধরনের ডায়াবেটিস ছাড়াও আরো কয়েক প্রকার ডায়াবেটিসের লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন। তারপরও আমরা দুই প্রকার ডায়াবেটিস নিয়েই আলোচনা করছি। যেমনঃ
টাইপ -১ ঃ যাদের শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন কম হয় বা একেবারেই উৎপাদন হয় না তাদেরকেই টাইপ ১ ডায়াবেটিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরণের সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের রক্তে সুগার বা চিনি সঠিক পরিমানে রাখার জন্য শরীরের বাইরে থেকে ইনসুলিন দিতে হয়। বলা যায় তারা ইনসুলিন নির্ভরশীল ডায়াবেটিক রোগী।
টাইপ -২ ঃ যাদের শরীরে যথেষ্ট পরিমান ইনসুলিন উৎপাদন হওয়ার পরও শারীরবৃত্তীয় কিছু ত্রুটির জন্য দেহকোষগুলি ঠিক মত ব্যবহার করতে পারে না সমস্যাগ্রস্ত সেইসব ব্যক্তিদেরকে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। টাইপ ২ ডায়াবেটিক সাধারণত বেশী বয়সে ধরা পড়ে এবং সঠিকভাবে খাবার এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন পরিচনা করলে সুগার নিয়ন্ত্রণ রেখে অন্যদশজন সুস্থ মানুষের মত জীবন চালানো সম্ভব।
ব্রিটেনে বিশেষজ্ঞ দ্বারা গঠিত কমিটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক সমীক্ষা এবং নানা পশু পাখির উপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন, বেশি পরিমান চিনি খাবারের সঙ্গে ডায়বেটিসের কোন সম্পর্ক নেই। বরং তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন, সুগারসমস্যাগ্রস্ত (ডায়বেটিস রোগীদের) ব্যক্তিদের জন্য যে ফ্রুকটোজ বা সরবিটল দেওয়া হয় তাতে অনেক সময় শরীরের ক্ষতিসাধিত হয়।
উক্ত গবেষকদল আরো বলেছেন, সুগারসমস্যাগ্রস্ত (ডায়াবেটিস ধরা পড়া) হওয়া মানেই আপনাকে চিনি খাওয়া বাদ দিতে হবে, তেমনটি নয়। আর হাইপো (টাইপ ১ এর ক্ষেত্রে) হয়ে গেলে সুগার ট্যাবলেট খাওয়ানোই তার জন্য ঐসময় উপযুক্ত চিকিৎসা। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন এর রেফরেন্স দিয়ে আমরা এও বলতে পারি, খাবার সুষম হলে আলাদা করে চিনি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বর্তমানে ব্রিটেনের ডায়বেটিস অ্যাসোসিয়েশন সুগারসমস্যাগ্রস্ত (ডায়বেটিস) রোগীর খাবারে ২৫ গ্রামের মত চিনি রাখা যেতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন ।
যাদের সুগারসমস্যাগ্রস্ত (ডায়াবেটিস) নেই তাদের চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবারে নিয়ন্ত্রণ করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার আমাদের শরীরে শক্তি যোগায়। ফলে চিনি কম খেলে দেহে প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরে শক্তি উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু শরীরের জন্য নির্দিষ্ট পরিমান শক্তি অবশ্যই দরকার। ফলে ডায়বেটিস হবে এই ভয়ে চিনি কম খেলে তার পরিণাম ভাল না হয়ে খারাপই হবে। এই কুসংস্কারের সাথে সাথে আমাদের সমাজে এও বহুল প্রচলিত রয়েছে ‘তোর ডায়াবেটিস হয়েছে, তোর না খেয়ে থাকতে হবে বাকী জীবন’। এ কথাটাও অনেকাংশে ভুল ধারণ। আমরা যদি হাদিসের বর্ণিত কথা উল্লেখ করি তা হলেও বলতে পারি, পেঠ ভরে না খেতে বলা হয়েছে। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও তাই ‘না খেয়ে থাকতে হবে, তা বলে আমরা বলতে পারি, পরিমিত খাবার খেতে হবে। শুধুমাত্র ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রেই নয়, একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও তা প্রয়োজ্য।
এই জন্য আমরা বলতে পারি, ডায়াবেটিস একজেনর, জানা দরকার সকলের। ডায়াবেটিস সম্বন্ধে আমাদের সামাজের সকলের সঠিক ধারণা থাকলে একদিনে যেমন খাদ্যের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত ধারণা থাকবে না ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস নিয়ে আমাদের সমাজে বিভিন্ন কুসংস্কারও থাকবে না।

লেখক ঃ মোঃ মাজহারুল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী
এসো সচেতন হই সোসাইটি (এসই)
ই-মেইল ঃ mazharulsust86@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে