অপেক্ষমাণ

0
476

বুড়ো গাছটির পাতাগুলো ঝড়ে-ঝড়ে পড়ছে। গাছটির নিচে অনেকগুলো পাতা পড়ে আছে। হালকা বাতাসে কিছু পাতা সরে যায় কিছু পাতা উড়ে। বাতাসটা খুব কনকনে ঠান্ডা মনে হচ্ছে নাবিলের। নাবিলের পাতলা টিনটিঙ্গে শরীরে একটা কাঁপুনি দিয়ে যায়। নাবিল পড়ে আছে পাতলা একটা শার্ট। আজ সে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মনে করেছিল শীত বিদায় নিয়েছে আর আসবে না, তাই গরম জ্যাকেটটা গায়ে না দিয়েই বের হয়ে পড়েছে। খুব শীত লাগছে। মাঘের হাওয়া কি এখনও শেষ হয়নি। বোধ হয় মাঘের শেষ পর্যায়ে। এই বাতাস ফাল্গুন আগমনের বাতাস। ফাল্গুন মাস তরুন-তরুনীদের বড়ই আমোদের মাস। মাসটিতে যেন তারা তাদের মনের নীল আকাশে রঙ বেরঙ্গের ঘুড়ি উড়ায়। মনের ক্যানভাসে প্রিয় জলরং এর ছোঁয়ায় চিত্র আঁকে। যে চিত্র কেউ দেখতে পারে না; ছোঁতে পারে না, বুঝতে পারে না। শুধু তারাই দেখে, বুঝে, চিত্র গুলো কেনার কারও সামর্থ্য নেই। শুধু তাদেরই আছে কেনার-সামর্থ্য, তারাই পারে তাদের মনের দেয়ালে চিত্রের বোর্ডগুলো টাঙ্গিয়ে রাখতে। শাদা কাপড় দিয়ে মাঝে মাঝে মুছে নিতে।
ফাল্গুনের পহেলা দিনে হলুদ গাঁদা ফুল দিয়ে চুলগুলোকে খোঁপা করে রঙ্গ বেরঙ্গের শাড়ীতে সাজে যুবতীরা। যুবকেরা সাজে লাল হলুদ পাঞ্জাবিতে। তারাই ফিরে আনে বাংলার সাজ বাংলার ঐতিহ্য। এই বাংলা অনেক দামে কেনা অনেক রক্তের বিনিময়ে তৈরী করা এই বাংলা। তাদের বাংলা নিয়ে দু কথা বলার কারও সাহস নেই। ৫২ এর ফাল্গুন মাসেই তো এদের মত জোয়ানেরা মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য রাস্তাই নেমে পড়েছিল। একের পর এক স্লোগান দিয়েছিল। নিষ্ঠুর পুলিশদের গুলিতে অনেক মেধাবী জোয়ানরা নির্মমভাবে হত্যা হতে হয়েছিল। শুধু মাত্র ভাষার জন্য। তারা উর্দু চায় না মায়ের ভাষা বাংলায় চায়।
নাবিলের শরীরে আর একটা শীতের কাঁপুনি বাতাস বয়ে যায়। প্যান্টের পকেট থেকে মুঠোফোনটি বের করে ডিসপ্লেতে দেখতে পায় সময় দশটা তের মিনিট। নাবিল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। ভাবে সে আসতে আর কতক্ষন লাগবে কে জানে। আজ তাকে অপেক্ষা করতেই হবে। দেখা করতেই হবে। আমার মনের আকাশ দিয়ে অনেক মেঘ জমেছে। হতেও পারে মানুষটি এম.এ পাশ করা যুবকটির মেঘগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। আশা রাখতেই হবে। আশার মধ্যেইতো অনন্দ খোঁজে পাওয়া যায়, আশাই যেন মানুষের জীবনের পথচলা, আজ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আমার বের হওয়াটা বাবা বেশ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ছিল। আজ বাবার চাহনিটা কেন জানি বেশ নীরীহ মনে হয়েছে। চোখগুলোতে বেশ আশাও খোঁজে পাচ্ছি। মাকেও দেখতে পেলাম সকাল বেলা আমার জন্য তাড়াতাড়ি যতœ সহকারে নাস্তা তৈরী করতে। ভেতরের ঘরে আমার বড় আপা। গর্ভবতী মা’ই তাকে শ্বশুরবাড়ী থেকে নিয়ে এসেছিল এই সময়টিতে যেন মা দেখভাল করতে পারে। আপার যে কোন সময় প্রসব যন্ত্রণার ব্যাথা উঠতে পারে। জানি অনেক কষ্ট। আমার দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দেয়। আমার মঙ্গল হোক সে ভেবে। ছোট বোন তাড়াতাড়ি চার্জ থেকে ফোনটি খুলে আমার হাতে দিয়ে যায়। যেন আমি ভুলে না যায়। সবকিছু খুব গোছানো।
হায়দার সাহেব আসতে- কি আরও দেরি লাগবে? কে জানে। তিন তলায় উঠে আমি তার অফিসে আবার খোঁজ নিলাম। এখনও আসেনি। অফিসের রিসেপশনিষ্ট মেয়েটি বেশ হাসিমুখে জানালো। আমি আবার অফিসের নীচে নেমে আসলাম। মেয়েটি অফিসে বসে অপেক্ষা করতে বলেছিল। ভেবে দেখলাম অফিসে বসে অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। অফিসের প্রতিটি কক্ষে সবাই তাদের কাজকর্ম নিয়ে বেশ ব্যস্ত। সেখানে আমার কাজ ছাড়া বসে থাকা কোন মানে হয় না। খানিক দূরে বেশ ছোট আকারের চায়ের দোকান দেখতে পাচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে দোকানটির সামনে যায়। দোকানটিতে বসে চা খাওয়ার জন্য তিনটি লম্বা টুল আছে। টুলগুলোতে সবাই চা খাচ্ছে আর আড্ডায় ব্যস্ত। দোকানদার বয়স্ক লোকটি চা বানাতেই আছে, কারও দিকে তাকানোর সময় নেই। লোকটির বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি হবে। কালো শ্যাম বর্ণের রং, চুল, দাড়ি সবই পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। বেশ গম্ভীর ভাবে চা গুলো বানাচ্ছে। কনডেন্স মিল্কের কৌটা খুলছে। জানি মুখখানি গম্ভীর হলেও তার মনের মধ্যে অনেক আনন্দ আছে। দোকানে প্রচুর লোকজনে ভিড়। যেমন ভিড় তেমন বিক্রিও মন্দ নয়। তিনি সবসময় এমনটি চান। টুল থেকে একজন লোক উঠে চলে যায়। এবার কোন রকমে আমার বসার ঠাঁই হলো। ষাটের বয়সী লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলে দুধ চা, না লাল চা? লাল চা। চট করে বানিয়ে চা টি আমার হাতে দেয়। চায়ে আমি এক চুমুক দিই। আমার পাশের, সামনের টুলের লোকগুলো একেকজন এক এক বিষয় নিয়ে কথা বলতে থাকে। কেউ রাজনৈতিক, কেউ অর্থনৈতিক, কেউ খেলাধুলা, কেউ বিনোদন, কেউ ভালবাসা, কেউ ঋণ নিয়ে আর কেউ অভাবের সংসার নিয়ে। চায়ে আর একটা চুমুক দেয়। ঘাড়টা খানেক ডান পাশ দিয়ে ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি হায়দার সাহেবের সে সাদা গাড়িটি অফিসের দিকে ঢুকছে। হায়দার সাহেব তাহলে চলে এসেছে। আমি চা টা তাড়াতাড়ি শেষ করি। চায়ের পয়সাটা দিয়ে অফিসের দিকে ছুটতে থাকি। অফিসের রিসিপসানের সামনে আসি, রিসেপশান খালি। রিসিপশানিষ্ট মেয়েটি উধাও। বোধ হয় হায়দার সাহেবের রুমে ঢুকেছে। অফিসের অপেক্ষমাণ সোফাটিতে বসে অপেক্ষা করি। খানিকবাদে হায়দার সাহেবের রুম থেকে বের হয় মেয়েটি। মেয়েটির আগের হাসি মাখা চেহারাটি কেন জানি মলিন হয়ে গিয়েছে। রুমের ভেতরে কি হয়েছে কে জানে? হায়দার সাহেব কি কড়া ভাষায় তাকে কিছু বলেছে? হতেও পারে। চাকুরীত এমনই। উনিশ-বিশ হলেই অনেক কড়া ভাষা শুনতে হয়। ভুল বলতে কিছুই নেই। এরপর মেয়েটি আমাকে হায়দার সাহেবের কক্ষে যেতে অনুরোধ করে।
কক্ষে হায়দার সাহেবের সামনে বসে আছি। বেশ দামী টেবিল চেয়ার মনে হচ্ছে। বেশ সাজসজ্জাপূর্ণ বিলাসীতাময় একটি কক্ষ। হায়দার সাহেব চোখে তার চশমাটা ঠিক করে আমাকে বলে- তো নাবিল তোমার আর কি অবস্থা, চা-নাস্তা কিছু করেছ? আমি বলেছি জ্বি ভাইয়া করেছি। হায়দার সাহেব নাবিল আমি আগামীকালের ফ্লাইটে আমেরিকা যাচ্ছি। তার কারণে আমি খুব ব্যস্ততার মাঝে আছি। তোমাকেও আমি অনেকক্ষন বসিয়ে রেখেছি। আর মাসুদ সাহেবের সাথে কথা বলেছিলাম। আমি তখন মনের মধ্যে খানেক আনন্দ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করি মাসুদ সাহেব কি বলেছে? হায়দার সাহেব-মাসুদকে যে পোষ্টের কথা বলেছিলাম সেটা তার শালা অর্থাৎ স্ত্রীর আপন ছোট ভাইকে দিতে হচ্ছে। সে আমাকে বলে ভাই আমি অনেক চেষ্টা করেছি আপনার কথা রাখার জন্য। কিন্তু আমার শালাকে চাকুরীটা দিতে না পারলে সংসারে আগুন জ্বলবে। প্রাকৃতিক আগুন পানি দিয়ে নিভানো সম্ভব। কিন্তু এই আগুন পানি দিয়ে কেউ নিভাতে পারবে না। এই আগুন জ্বলতে থাকলে আমার সব শেষ। শেষ। ভাই আমাকে মাফ করে দিয়েন। বুঝেছ নাবিল বিয়েতো এখনও করনি। দুনিয়ার সব চোর ডাকাতি খুন-খারাপি যা দেখছ সব পয়সার জন্য। বউ-বাচ্চার সুখের জন্য। আমি তখন আটকানো নরম কন্ঠে বলি তাহলে ভাইয়া চাকুরীটা কি হবে না? হায়দার সাহেব আবারো আশা দিয়ে বলে চাকুরী হবে না কেন। অবশ্যই চাকুরী হবে। তবে মাস খানেক অপেক্ষা করতে হবে। তখন যদি আমার অফিসের পোষ্ট খালি থাকলে আমার অফিসেই হবে আর যদি মাসুদ সাহেবের অফিসে পোষ্ট খালি থাকলে তার অফিসে। তখন আমার মুখ দিয়ে কথা বের হবে হবেও হচ্ছে না। অনেক সাহস নিয়ে বের করে বলি-আরও মাস খানেক!
আমি হায়দার সাহেবের অফিসের তিন তলার সিঁড়িগুলো দিয়ে খুব ধীরে ধীরে নামছি। সিঁড়ির এক একটা ধাপ আমার কাছে মনে হচ্ছে এক একটি পাহাড় অতিক্রম করে করে নামছি। নামতে এত কষ্ট-ক্লান্ত কেন মনে হচ্ছে। দিনটিতে এখনও পর্যন্ত কোন পরিশ্রম করা হয়নি। তারপরও এমন লাগছে কেন? এভাবে করে অফিসের মূল গেট থেকে বের হয়। শীতের কাঁপুনি বাতাসটা এখন আর নেই। চারিদিকে রোদে ঝলমল করছে। এখন কোথায় যাব? ঘরে যাব? ঘরে গিয়ে কি বলব, সবাইকে চাকুরী হয়ে গিয়েছে বলব, না এত বড় মিথ্যা বলা যাবে না। আবার হয়নি বললেও বাবা-মা ও বোনেরা সবাই খুবই কষ্ট পাবে। খুবই। প্রশ্নের পাহাড় জমে আছে আমার মনে। পকেটে মুঠোকোনের রিং বেজে ওঠে। মায়ের ফোন। নিশ্চয় আমার চাকুরীর খোঁজ খবর নিতেই ফোন দেওয়া। ফোন-টা রিসিভ করি। মা বলে নাবিল তুই কোথায়? আমি বলি রাস্তায়। মা-শোন তুই তো এখন মামা হয়ে গিয়েছিস। তোর আপার ছেলে হয়েছে। তাড়াতাড়ি চলে আয়। তারপর ফোনটা রেখে দেয়। বাহ্, মাকে অনেক খুশি মনে হচ্ছে। শুধু মা নয় নিশ্চয় পরিবারের সবাই খুশি। অনেক। যেন শুকিয়ে যাওয়া খালে অনেক বৃষ্টি হয়ে খাল এখন পানিতে ভরপুর। স্রোতের পর স্রোত নিয়ে চলতেই আছে। খালটি প্রাণ খোঁজে পেয়েছে। মালবাহী নৌকোগুলো আর মাছ ধরার নৌকোগুলো খুব দ্রত ছুটছে। নৌকোর মাঝিদের, জেলেদের খুব ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কারও দিকে তাকানোর সময় নেই। এমনই।

আবরার সিদ্দিকী

Leave a Reply