বিভূতিভূষণের অপু দূর্গা আজ আমার অন্তরাত্মায়:-

0
914

বিভূতিভূষণের অপু দূর্গা আজ আমার অন্তরাত্মায়:-
সুজাতা দাস:-(কোলকাতা)

সর্বজয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে অপু ফিরে এসে আজ কয়েকদিন ধরে “উলাতে” মায়ের ঘরটাতেই রয়েছে-
কাল সব কাজ শেষ,সব ছিন্ন হয়ে যাবে রক্তের সম্পর্ক গুলোর শেষেরটাও, মনে মনে ভাবছিল অপু-
দিদি দূর্গার কথা আজ খুব মনে পরছিল সকাল থেকে,একটা কষ্ট গলার কাছে আটকে ছিল অপুর-
মনে পরছিল দূর্গা দিদির কথাটা, “ভয় কী অপু আমি আছি তো তোর সাথে”-
আজ তুই কোথায় দিদি?
নিরুপমা দিদি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন,বললেন অপু এইটাই প্রকৃতির নিয়ম মা কারো চিরদিন বেঁচে থাকেন না-
এ’কদিন নিজের দিদির মতোই আগলে রেখেছেন-
রাতে শুয়ে সেইসব কথাই ভাবছিল সে-

আজও একতারাটার টুংটাং আওয়াজ কানে ভেসে আসছিল অপুর-
হঠাৎ কানে এলো অপুউউউ ডাকটা যা দূর্গা দিদি ডেকে চলতো সবসময়-
আধো জগরনে দেখলো সে আর দিদি কাশের বনে ছুটে চলেছে রেলের লাইন দেখার উদ্দেশ্যে-
টেলিগ্রাফের তাঁরের খুঁটিটা ঠিক তেমনই আছে-
কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না পাঁকা রাস্তাটা-
রাঙিগাইএর বাছুর টা কোথায় গেল দিদি?সেকি আমাদের মতোই পথ চিনতে পারছে না?
বাবা আগে আগে চলছে জজমানের বাড়ি, পেছনে সে মুখ ফুলিয়ে আছে রেলের গাড়ি দেখতে পেলনা বলে-
মন ভালো হয়ে গেছিল সেখানকার মোহনভোগ খেয়ে-
সব দেখতে পাচ্ছে পরিস্কার-

এই অপু এখনও ঘুমাচ্ছিস তুই?কত বড়
হয়ে গেছিস তবুও এখনও একই রকম আছিস তুই-
তুই এখনও সেই ছোট্ট বেলার মতো করেই ঘুমাস অপু?
দূর্গার গলা পেয়ে ঘুমভাঙা চোখে চেয়ে রইলো অপু অবাক বিস্ময়ে-
কিরে অপু আমাকে চিনতে পারছিস না? বলল দূর্গা
হঠাৎ দূর্গা কে সামনে দেখে জড়িয়ে ধরলো অপু!!
কোথায় চলে গেছিলি সেই ঝড় জলের রাতে দিদি?
মা কত কাঁদলেন,তুই কোনও সারা দিচ্ছিলি না বলে-
তারপর থেকে আমি খুঁজেছি, খালি খুঁজেছি তোকে দিদি-
কোথাও খুঁজে পাইনি-
কোথাও তো যাইনি আমি অপু-
আজও খুঁজে ফিরি তোকে নিশ্চিন্দিপুরের গ্রামে গড়ের পুকুরে,খুঁজে ফিরি যেখানে আমরা দুজনে ঘুরে বেড়াতাম অপু-
তোর মনে আছে অপু গড়ের পুকুরের কথা?বলল দূর্গা-
খুব মনে আছে সেই পানি ফল;সেই ঝড় বৃষ্টির সন্ধ্যায় আম কুড়াতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে একসা,বলল অপু-
অপু যখন তোরা এখান থেকে চলে গেলি কাশিতে, আমি খুঁজেছি অপু তোদের সব সময় খুঁজেছি-
তোরা আর ফিরলি না নিশচিন্দি পুর,আমি আছি আজও অপু-
তোর মনে আছে দিদি আমাদের রাঙি গাইএর বাছুর হারিয়ে গেল যেবার ,খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম সেই রেললাইন দেখতে!!
পথ হারিয়ে জলা বিল পেরিয়ে সেই একাকার অবস্থা পাঁকা রাস্তায় উঠতে-
এখনও তোর মনে আছে অপু?
এখন ঐসব ছেলেমানুষির কথা ভাবলে হাসি পায় রে দিদি-
পরে বাবার সাথে তার জজমানের বাড়ি যাবার পথে দেখলাম সেই রেললাইন-
দুটো লোহার লাইন সমান ভাবে পড়ে আছে,অবাক হয়েছিলাম গাড়ি পিছলে পড়ে না বলে-
আমি খুব অবাক হয়ে বায়না করেছিলাম রেলগাড়ি দেখবো বলে,দেরি হচ্ছে বলে বাবা দাঁড়ালেন না-
খুব দুঃখ হয়েছিল তখন দিদি-
এখন তুই কত ট্রেনে চড়িস অপু!!
আমার আর ট্রেনে চড়া হলোনা অপু-
তোর মনে আছে আমরা কত বৈঁচি আশসেওড়ার ফল খেতাম অপু?
তুই ভেবেছিস আমি কিছু জানিনা!!
বাবা মরা গেলেন আমি জানতে পারিনি অপু-
তারপর তোরা “উলাতে” এসে উঠলি-
তুই পড়তে চলে গেলি মা খুব একা হয়ে গেছিলেন রে অপু-
ঘুরে বেড়াতেন নিজের মতো-
তাঁর প্রাণের অপু হষ্টেলে কী খাচ্ছে তার ঠিক নেই ;তিনি কী করে মুখে খাবার তোলেন-
অপু ভোর হয়ে এলোরে,তোর অনেক কাজ বাকি উঠে পর এবার, আজ অনেক কাজ অপু মা যে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের জন্য অপু,আমি আসি রে-
দুর্গার চলে যাবার দিকে তাকিয়ে দিদিইইইইই করে ডেকে উঠতে গিয়ে দেখলো দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ-
হঠাৎ কেঁদে উঠলো অপু দিদিইইইইই বলে-
সেদিনের সারা রাতের জল ঝড়ের পরে দূর্গার জ্বর ছাড়লে তাঁকে ডেকে শেষ বারের মতো বলে ছিল অপুকে,তুই একদিন রেলগাড়ি দেখাবি অপু?
এটাই জীবনের শেষ কথা ছিল দূর্গার,তারপরেই সব শেষ হয়ে গেছে-
কড়া নাড়ার আওয়াজ বাড়তে থাকায় উঠে বসলো, সারা দিল খুলছি বোলে-
খুব সামান্য আয়োজনে মায়ের কাজ শেষ করলো অপু নিরুপমা দিদির আর তেলিবাড়ির লোকের সাহায্যেই-
কাজ শেষে খুব কাঁদলো অপু যেটাকে সে মুক্তি ভেবেছিল আজ তাঁর অসহায়তা টের পেল সে যাবার মুহূর্তে-
মায়ের হাতে তৈরি নকশি কাঁথা আর নরুনটা সাথে নিল শুধু অপু;পরে রইলো আচারের বোয়াম আমসত্ত্বের হাঁড়ি আরও অনেক কিছু, যেগুলো আজ কাপড় না ছেড়ে ধরলেও বলার কেউ নেই-
পড়ে রইলো নিশ্চিন্দিপুরের আর উলার সমস্ত স্মৃতি পেছনে যা ছেলেমানুষের মুক্তি ভেবেছিল হয়তো সে-
বন্ধন মুক্তি একটা আনন্দ হয়তো যা নিরানন্দকেই আহ্বান করে শেষ মুহূর্তে –
যা আজ অপু অনুভব করলো-

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে