অসময়েও ফল্গু বয়

0
708

অসময়েও ফল্গু বয়

সুজাতা দাস (কোলকাতা)

অদ্ভুত একটা দৃষ্টি নিয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়েছিল পৃথ্বী;চমকে উঠেছিল শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে-
মেয়েটির তাকানোতে অসহায়তা ছাড়াও কিছু বক্তব্য ছিল;ভালো করে তাকিয়ে দেখলো পৃথ্বী-
শরীরের সর্বত্র মাতৃত্বের প্রকাশ দেখে চমকে উঠে ছিল পৃথ্বী-
এরা কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে মনে মনে ভাবলো পৃথ্বী;
একটা হাত আপনা থেকেই উঠে এসেছিল মাথায়-
কোথায় থাকিস তুই?বলেছিল পৃথ্বী
বির বির করে কী বলেছিল মেয়েটি কিছুই বুঝতে পারেনি পৃথ্বী-
তোর মা বাবা কোথায় জিজ্ঞাসা করেছিল পৃথ্বী
শুধু মাথা নেড়েছিল খালি মেয়েটি-
একটা অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তখনও তাকিয়ে আছে পৃথ্বীর দিক মেয়েটি-
কী করবে ভাবছে পৃথ্বী-নিজে সে একটা NGO সাথে যুক্ত; অসহায় প্রসূতিদের দেখভাল আর আশ্রয় দেওয়াই তার কাজ-
কিন্তু একে সোজা নিয়ে গিয়ে ওঠানো যাবে না কিছু নিয়ম কানুন থাকে সেখানেও;ফেলে চলেও আসতে পারলো না পৃথ্বী-
পরন্ত বিকেলের আলোতে মেয়েটির অসহায়তা যেন অনেক বেশি বুকে বাজছিল পৃথ্বীর;এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে থাকলো সে কাউকে দেখা যায় কিনা-
হঠাত্ দুর থেকে একজনকে আসতে দেখল পৃথ্বী;তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো মেয়েটিকে চেনে কিনা-
সেই লোকটি বলল না বাবু ও মেয়ে এখানকার নয় কোনও দিন দেখেও নি আজই প্রথম দেখলাম;কোথা থেকে এসেছে তাও জানিনা বাবু-
লোকটি চলে যেতে মাকে ফোন করলো পৃথ্বী;সব বুঝিয়ে বলল মাকে প্রথমে একটু আপত্তি করলেও পরে রাজি হলেন অনন্যাদেবী পৃথ্বীর মা-
এতটা রাস্তা কিভাবে নেবে ভাবলো পৃথ্বী;একে তো এই অবস্থা তার উপর না খাওয়া-
কিছু করার নেই-মেয়েটিকে বলল বাইকে বসতে পারবে?
ঘাড় কাত করে হ্যা বলাতে পেছনে বসিয়ে খুব আস্তে আস্তে বাড়ি এসে পৌছালো পৃথ্বী-
দুর থেকে দেখতে পেল মা দাড়িয়ে আছেন দরজায়-
মেয়েটিকে মার হাতে দিয়ে পৃথ্বী ঢুকে গেল নিজের ঘরে;একটা নিশ্চিন্ততায় চোখ বুঁজে এলো-
হঠাত্ একটা হাতের ছোঁয়ায় চোখ মেলো পৃথ্বী দেখলো হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা-
তাড়াতাড়ি উঠি বসলো পৃথ্বী;অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ আর অস্ফুটে ই বলল তুমি বাবা!!
আজ খুব আনন্দ হচ্ছে রে পৃথ্বী-বললেন বাবা
কেন বাবা?বলল পৃথ্বী
তুই আজ আমার বুক গর্বে ভরিয়ে দিয়েছিস বাবা-বললেন পৃথ্বীর বাবা পৃথ্বীর মাথায় হাত রেখে-
জানিস পৃথ্বী একদিন আমি পারিনি তোর মতো করে
ভাবতে;যদি লোকে আমাকেই দোষী ভাবে সবাই তাই ফেলে এসেছিলাম একদিন আমার কাছে সাহায্য চাওয়া একটি অসহায় মেয়ে কে-
সেই সময় তোর মায়ের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে;অনেক ভাবনা গ্রাস করেছিল সেই মুহূর্তে-আমি সদ্য বিয়ে হওয়া তোর মাকে সেদিন দুঃখ দেবার কথা ভাবিনি পৃথ্বী আর নিজেকেও ক্ষমা করতে পারিনি তাঁরপর বিশ্বাস কর-
তবে একটাই সান্তনা তুই আমার কাছে-
যখন মন শক্ত করে আবার ফিরে গেছি সেখানে;একদম পুত্রের জন্ম দিতে গিয়ে বিনা চিকিৎসাআর বিনা পরিচর্যাতে অসহায় অবস্থায় নিজের সন্তান কে রক্ষা করতে গিয়ে ঠান্ডা তে মারা গেছে মেয়েটি-
অদ্ভুত ভাবে বাচ্চা টি বেঁচে আছে খিদে আর ঠান্ডাতে মৃতপ্রায় সকলেই দেখে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল-আমি বাচ্চা টিকে কোলে তুলে সোজা বাড়ি এসে তোর মায়ের হাতে দিলাম-খালি বলতে পেরেছিলাম বাচ্চাটা যদি না বাঁচে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না-
সেই থেকে তুই আমাদের কাছে পৃথ্বী হয়তো তোর অযত্ন আর অবহেলা না হয় তাই আমাদের আর কোনও সন্তান ও হলো না-
অনন্যা কিন্তু তোকে নিজের ছেলের মতোই ভালো বেসেছে আর কখনও জানতেও চাননি তুই কে পৃথ্বী-
তুই পৃথ্বী-তোর কর্ম হোক্ অসহায়কে উদ্ধার করে আস্রয় দান করা তুই পারবি পৃথ্বী আমি তোকে আশীর্বাদ করি-আশীর্বাদ করি-
আবছা হতে থাকা বাবার গলার স্বরে চমকে উঠে যখন তাকাল পৃথ্বী-দেখলো মা ডাকছেন আরে তুই এই অবস্থায় ঘুমিয়ে পরেছিস?
পরিস্কার হোসনি স্নান করিস নি কেমন ছেলেরে তুই এই অসময়ে কেউ ঘুমিয়ে পরে বলতো-বললেন অনন্যা দেবী-
তাড়াতাড়ি স্নান করে খেতে আয়-বলে বেরতে গিয়ে ও ঘুরে তাকালেন ছেলের দিকে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে পৃথ্বী অনন্যা দেবীর দিকে-
কি হলো!!এগিয়ে গেলেন ছেলের দিকে-হঠাত্ ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো পৃথ্বী ছোট্ট বেলার মতো অনন্যা দেবিকে-
আরে কী হলো খোকা ছাড় ছাড়- বললেন অনন্যা দেবী
আর তোমাকে ছাড়বো না মা কখনও তুমি দেখ এবার তোমার পৃথ্বী তোমার মতো করে চলবে মা –
তুমি খালি এভাবেই জড়িয়ে রেখো মাগো আমাকে ঠিক এই ভাবে-
হঠাত্ অনন্যা দেবী অনুভব করলেন অনেক দিন বাদে আজ আবার তিনি সম্পূর্ণা হতে পেরেছেন-
হঠাত্ একটা নোনতা স্বাদ মনে করালো আজও ফল্গু বয়ে চলে অন্তশলীলা হয়ে-
একটু শক্ত করেই জড়িয়ে ধরলেন পৃথ্বী কে আবার অনন্যা দেবী-

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে