স্বপ্ন আর বাস্তবতার সংযোগস্থল: প্রবাসের দিনকাল।

0
828
জেবুন্নেছা জ্যোৎস্না, আমেরিকায় বাংলাদেশী প্রবাসী
এ কেমন দ্বৈত জীবন ছড়িয়ে দিলো দয়াল চোখের রেটিনা জুড়ে? আজ তক কেবল স্বপ্নই দেখি জাগ্রতে আর অচেতনে! যখন দেশে থাকতাম, তখন ঘুমের মধ্যে নদী, আর সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। ঘুম ভাঙ্গার পরও সেই ভাললাগার রেশ ছড়িয়ে থাকতো কিছুক্ষণ। তারপর যখন আমেরিকা এসেই প্রেগন্যান্ট হলাম, কিছুই খেতে পারতাম না, প্রচন্ড ভাবে মিস করতাম পটল, দেশী লাউ, বেগুন, পুঁইয়ের বিচি,আর কদবেল। তখন রাতভর দেশেই কাটাতাম; ঝকঝকা সকালের রোদে ভ্যানে করে সব্জিয়ালা এসে দাঁড়াত, তারপর আম্মা সেখান থেকে তরতাজা সব্জি কিনত; কিন্তু রান্না আর হতো না.. হঠাৎ চোখ মেলে জানালা দিয়ে দেখতাম নীল আকাশের বুক চিরে সাদা একখানা প্লেন চলে যাচ্ছে.. বুকটা ধ্বক করে উঠতো, কেন আমি না খেয়ে চলে এলাম এখানে! তারপর সময়ের সাথে সাথে এদেশের আলু-বেগুন-মটরশুটি ভালবাসতে শিখি; তখন কদাচিৎ পটল পাওয়া গেলেও পটলের দাম খুব বেশী দেখে তার মায়া ত্যাগ করি, আর জামাই খুব ভালবেসে মাঝেমধ্যে প্যাকেট কদবেলের ভর্তা এনে দেয়, কিন্তু সেটাকেও বাধ্য হয়ে ত্যাগ করেছি কারণ খেলে পেটের মধ্যে জীবাণুর ধুম-ধারাক্কা পার্টি শুরু হয়ে যায়… যার পরিণতি ঘন ঘন বাথরুম, আর খাবার স্যালাইন।
একদিন শখ হলো কাজ করবো।সদ্য দেশ থেকে মাস্টার্স করে এসেছি তাই ছোট বাচ্চা নিয়ে আর পড়ার কথা মাথায় এলো না। একটা ডানকিনে ঢুকে জীজ্ঞেস করলাম ওদের লোক লাগবে কিনা? সঙ্গে সঙ্গে আমার জব হয়ে গেল.. পরদিন থেকে ট্রেনিং। গার্বেজ ফেলা, বিশাল সাইজের মব দিয়ে ফ্লোর ক্লিন করা থেকে সব কাজ শিখতে লাগলাম.. আর ঘুমালেই .. মে আই হেল্প ইউ! স্টোরের চাইতে রাতে বেঘোরে মনে হয় বেশী কাজ করতাম.. কাজ করতে করতে গা ব্যথা হয়ে যেত, জামাই মনে হয় কষ্টটা বুঝতে পারতো, সে ম্যাসাজ করে দিত.. আর আমি স্বপ্নের মধ্যে কফির পর কফি বানাতে থাকতাম। মন-প্রাণ দিয়ে সাতদিন সফলতার সাথে ট্রেনিং করার পর যখন স্ক্যাজুয়াল দিল, আমি তখন সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম। আর কাজে গেলাম না। একসপ্তাহের ট্রেনিংয়ে একটা চেক পেলাম, জীবনের প্রথম ইনকাম.. চেকটা ভাঙ্গায়েই একঘন্টার মধ্যে টাকা শেষ করে মনে হল, আহ্ জীবনটা কতো সুন্দর.. আমাকে আর কফি বানাতে হবে না।
বাসার সামনেই একটা ফুড বাজার, পনের বছর আগে একটা কোরিয়ান দম্পতি মালিক ছিল, আর এক ইন্ডিয়ান মহিলা ম্যানেজার .. আমাকে বললো একটা জব এ্যাপ্লিকেশন করে দিতে। দেবার সাথে সাথে জব হয়ে গেল। এবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেবল সব্জি আর ফলের কোড মুখস্ত করা। ওরে বাবাহ্! কতো বিদেশী ফ্রুট আর ভেজিটেবল? এগুলো কি আমি চিনি? শুরু হলো নাম আর কোড মুখস্তকরণ। ব্যানানা-৪০১১, আপেলই যে কতো রকম, আর ততোরকম তার কোড.. অনেক দ্রুত স্ক্যান করতে হবে, তাই কোড থাকতে হবে ঠোঁটের আগায়.. সে আরেক যুদ্ধ! কোড-ফোড মুখস্ত করে, একটা চেক পেয়ে দিলাম আবার কাজ ছেড়ে। চেকটা ভেঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে খরচ করে মনে সে যে কি শান্তি!
তারপর একদিন দোকানে গেলে মালিক বললো, তুই কাজ কর, তোর যেভাবে সুবিধা সে ভাবে কর। বললাম ঠিক আছে, জামাই বিকালে বাসায় যখন থাকবে তখন আমি ৪ ঘন্টার জন্য এসে কাজ করবো তিনদিন। সারাদিন বাসার সব কাজ করে, বিকালে বাচ্চারা কি খাবে সেটা বানিয়ে তারপর কাজে যেতাম। পনের মিনিটের ব্রেকে বাসায় এসে বাচ্চাদের দেখে যেতাম। এইটুকু কাজেই আমি মালিককে অনেক হার্ড টাইম দিয়েছি। কোনদিন যেতাম না, কোনদিন তাড়াতাড়ি চলে আসতাম, পনের মিনিটের জায়গায় ব্রেক নিতাম আধা ঘন্টা। তারপর মহিলা একদিন রাগ হয়ে বললো, এমন করলে তোর আর কাজে আসার দরকার নেই, বাসায় থাক। একথা শুনে পর দিন থেকে আর কাজে যাই না, পরে মালিক ফোন করে আবার কাজে যেতে বললো। কিন্তু এ কাজটা ও আমার কষ্টের মনে হতো কারণ গ্রোসারী গুলা ব্যাগে ভরতে হতো। দিলাম এ কাজটাও ছেড়ে।
কয়েক বছর আর কাজ করলাম না, বাচ্চারা যখন ফুল টাইম স্কুলে গেল তখন বাসার পাশে ম্যাগডোনাল্ডসে ঢুকে পরলাম। কি ন্যাস্টি পরিবেশ! ছোট ম্যানেজাররা টাকা চুরি করে, আমি আবার বড় ম্যানেজারকে সেটা বলে দিতাম। একদিন এক আফ্রিকান আমেরিকান বললো, ‘তুমি এখানে কাজ করো কেন? তোমায় এখানে মানায় না.. তোমার জিইডি আছে? তাহলে তুমি পোস্ট অফিসে জব করতে পারবে’। সেই কৃষ্ণাঙ্গ কে আমি চিনি না, কিন্তু তার এই একটি কথা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। ম্যাগডোনাল্ডসে একমাস কাজ করার পর সেটিও দিলাম ছেড়ে।
বাসার পাশে বিশাল শপিং কমপ্লেক্স ‘টার্গেট’ দেখে মনে হল, ইস্ আমি যদি এখানে কাজ করতে পারতাম’! যেই ভাবা সেই কাজ.. দিলাম এ্যাপ্লিকেশন করে, হয়ে গেল কাজ। আমি মানুষকে ভাল কনভিস করতে পারতাম, তাই আমার কাজ ছিল মানুষ ধরে ধরে সার্ভে করানো। দৈনিক প্রচুর সার্ভে করাতাম এবং এর জন্য কাজ থেকে গিফট কার্ড সহ নানা উপহারও পেতাম। শুরু হলো আবার সেই ঘুমের মধ্যে কাস্টমার ধরে ধরে সার্ভে করার যন্ত্রণা..!
কয়েক বছর পড়া লেখা থেকে দুরে থাকার পর মনে হলো, আমি আবার পড়া শুরু করবো। টার্গেটের হিউম্যান রিসোর্স থেকে আমাকে সাহায্য করলো কোথায় যেতে হবে জিইডির জন্য। দেশে বাংলা মিডিয়ামে পড়েছি বিধায় জিইডি করাটা যুক্তিযুক্ত মনে হলো। হাজবেন্ডের সাহায্য ছাড়াই পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়ে এলাম স্কুলে। কাজ আর সংসারের পাশাপাশি শুরু হলো পড়াশুনা। অনেক সংগ্রাম করেছি, আর সব কষ্টের প্রতিফলন ঘটতো রাতে আরেক দফা ঘুমের মধ্যে পড়তে পড়তে আর পরীক্ষা দিতে। এগারো বছর টার্গেটে কাজ করেছি ইচ্ছামাফিক। পড়াশুনা শুরু করার পর ওদেরও অনেক হার্ড টাইম দিয়েছি, বছরে ছ’মাস যেতাম না, বাকী ছ’মাস সপ্তাহে একদিন কি দু’দিন। এক সময় খুব ভাল কাজ করতাম দেখে ওরা আমার সব অত্যাচার মেনে নিয়েছিল। আ্যাসোসিয়েট শেষ করার পর ব্যাচেলরে ঢুকে, পড়ার প্রচন্ড চাপে বাধ্য হয়ে কাজটা ছেড়ে দিতে হয়।
এখন আমি হসপিটালে সনোগ্রামে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্ক্যান করি, আর রাতে ঘুমের মধ্যে জামাইর হার্ট, লিভারে ট্র্যান্সডুসার ঘষে ঘষে স্নায়ু প্রেসারের উত্তেজনা প্রশমিত করি।
জেবুন্নেছা জ্যোৎস্না, আমেরিকায় বাংলাদেশী প্রবাসী

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে